ইউপি নির্বাচনের দু’দিন পেরিয়ে গেলেও থামছে না সহিংসতা, নিহত ৪

ঢাকা, ২৯ ডিসেম্বর – চতুর্থ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের ফল ঘোষণার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও সহিংসতা থামছে না।

মঙ্গলবার (২৮ ডিসেম্বর) ও আগের দিন সোমবার (২৭ ডিসেম্বর) রাতে সংঘর্ষ, হামলা ও গুলিতে আরো চারজন নিহত হন।
এর মধ্যে, জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে দুই পরাজিত মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে এক ব্যক্তি নিহত হন। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বিজয়ী ইউপি সদস্য ও যুবলীগ নেতা ফিরোজ কবীর ও তাঁর সমর্থকদের হামলায় পরাজিত ইউপি সদস্য নিহত হন। পাবনা সদর উপজেলার হেমায়েতপুরে পরাজিত দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে গুলিতে আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু হয়েছে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের গুণবতী ইউনিয়নে পরাজিত নৌকার প্রার্থীর এক সমর্থককে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ নিয়ে চলমান ইউপি নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় ৮৯ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে দুজন চেয়ারম্যান মনোনয়ন প্রত্যাশী, একজন চেয়ারম্যান প্রার্থী, দুজন সদস্য প্রার্থী, একজন নির্বাচিত সদস্য ও একজন পরাজিত সদস্য প্রার্থী।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের ইউপি নির্বাচনে ভোটের আগে ও পরে সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। চার ধাপের নির্বাচনে ভোটের দিন সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে মোট ২৪ জন। অথচ ভোটের আগে ও পরে প্রাণ হারিয়েছে ৬৫ জন। সর্বশেষ চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে ভোট চলাকালে প্রাণহানির সংবাদ না আসায় নির্বাচন কমিশন সচিব এই নির্বাচন আনন্দমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করেন। এর পরেই ওই রাতে তিনজন নিহত হওয়ার খবর আসে। ভোটের রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত আরো ৯ জন নিহত হয়েছেন।

এর আগে তৃতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ শেষে নির্বাচন কমিশন দাবি করে, সহিংসতামুক্ত মডেল নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু ভোট শেষে রাতেই বিজিবি সদস্যসহ ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সহিংসতা হচ্ছে মূলত ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে। ভোটগ্রহণের অনেক আগে থেকেই যেকোনোভাবে জয়ী হওয়ার চেষ্টা নির্বাচনপূর্ব সহিংসতা বাড়াচ্ছে। আবার ভোটের পরেও এক পক্ষ অন্য পক্ষকে এলাকাছাড়া করতে মরিয়া। ফলে এই সহিংসতা কেবল ভোটের দিনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এ অবস্থা কোনোভাবেই ইতিবাচক নয়।

সরিষাবাড়ীতে সংঘর্ষে নিহত

সরিষাবাড়ী উপজেলার ডোয়াইল ইউনিয়নের প্রসাদপুর ও হাসড়া মাজালিয়া গ্রামে মঙ্গলবার পরাজিত প্রার্থী রহমতুল্লাহ ও মন্টু মিয়ার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। উভয় পক্ষের সমর্থকরা লাঠিসোঁটা, রামদা নিয়ে একে অন্যের ওপর চড়াও হয়। এ সময় রহমতুল্লাহর সমর্থক আসাদুজ্জান আসাদ গুরুতর আহত হন। পরে তাকে সরিষাবাড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

গাইবান্ধায় পরাজিত ইউপি সদস্য নিহত

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নে গতকাল সন্ধ্যায় বিজয়ী ইউপি সদস্য ও যুবলীগ নেতা ফিরোজ কবীর ও তার সমর্থকরা বিজয় মিছিল নিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় চৌরাস্তায় পরাজিত ইউপি সদস্য শাহারুল ইসলামের সমর্থক শামসুল হক মিছিলের সামনে পড়েন। তাকে কবীরের সমর্থকরা বেদম মারধর করে। সে সময় শাহারুল ইসলাম পাশের আন্ধারীপাড়া গ্রাম থেকে দাওয়াত খেয়ে ফিরছিলেন। খবর পেয়ে তিনি শামসুলকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান। ফিরোজের উত্তেজিত সমর্থকরা তাকেও বেদম মারধর ও কিল-লাথি দেয়। গুরুতর অবস্থায় তাকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত শাহারুল সদ্য সাবেক ইউপি সদস্য ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সম্পাদক ছিলেন।

পাবনায় গুলিতে আ. লীগ নেতা নিহত

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পাবনা সদর উপজেলার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের নাজিরপুর বাজারে ইউপি নির্বাচনে পরাজিত নৌকার প্রার্থী মঞ্জুরুল ইসলাম মধু ও স্বতন্ত্র প্রার্থী তরিকুল ইসলাম নিলুর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় শামীম হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। তাকে উদ্ধার করে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। শামীম হোসেন (৩৫) হেমায়েতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ছিলেন।

কুমিল্লায় রেললাইনের পাশে মরদেহ

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের গুণবতী ইউনিয়নের দশবাহা গ্রামে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের পাশ থেকে সোমবার (২৭ ডিসেম্বর) রক্তাক্ত অবস্থায় ফরহাদ হোসেন (১৮) নামের এক তরুণকে উদ্ধার করে এলাকাবাসী। পরে ফেনী সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত ফরহাদ দশবাহা গ্রামের কবির আহমেদের ছেলে এবং চতুর্থ ধাপের গুণবতী ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী সৈয়দ আহমেদ ভুঁইয়া খোকনের সমর্থক। গত রোববার নির্বাচনে খোকনের প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তফা কামাল জয়ী হন।

নৌকার প্রার্থী সৈয়দ আহমেদ ভুঁইয়া অভিযোগ করেন, মোস্তফার সমর্থকরা ফরহাদকে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে রেললাইনের পাশে ফেলে রেখে চলে যায়।

তবে মোস্তফা দাবি করেন, ‘সোমবার আমি নির্বাচন-পরবর্তী ভোটারদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে বের হই। রাত সাড়ে ৯টার দিকে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারি, একটি ছেলে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছে। ’

আরো সংঘর্ষ, আহত ৪০

নেত্রকোনার খালিয়াজুরীর চাকুয়া ইউনিয়নের দাউদপুর গ্রামে গতকাল নবনির্বাচিত সদস্য অসিত মহানবীশ ও সাবেক সদস্য জ্যোতি মহানবীশের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়।

চাঁদপুরের কচুয়ার পশ্চিম সহদেবপুর ইউনিয়নের প্রসন্নকাপ গ্রামে সোমবার রাতে নৌকার প্রার্থীর নির্বাচনী অফিস, দুটি সাউন্ড সিস্টেম ও আসবাব ভাঙচুর এবং পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহৃত দুই সেট মাইক নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

আড়াইহাজারে সহিংসতা, আহত ৩০

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ইউপি নির্বাচনের জের ধরে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাটের ঘটনা ঘটছে। গত দুই দিনে উপজেলার আতাদী, সুলতানসাদী, দৈবই, কাদিরদিয়া ব্রাহ্মন্দী এলাকায় পরাজিত ও বিজয়ী ইউপি সদস্য প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে এসব সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে।

সূত্র : বাংলানিউজ
এন এইচ, ২৯ ডিসেম্বর

ইউপি নির্বাচনের দু’দিন পেরিয়ে গেলেও থামছে না সহিংসতা, নিহত ৪

সূত্রঃ দেশে বিদেশে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: