পদ্মা সেতুর চেয়েও ব্যয়বহুল হতে যাচ্ছে বহুল প্রতিক্ষিত মেট্রো রেল

ঢাকা, ১৩ জানুয়ারি – বহুল প্রতিক্ষিত মেট্রো রেল প্রকল্পের নকশায় নতুন সমস্যা দেখা দেওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় এবং সময় বাড়তে যাচ্ছে। দেখা গেছে স্টেশনে ঢোকা ও বেরোনোর পয়েন্টগুলো ব্যবহারের জন্য সুবিধাজনক নয়।

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানির (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন সিদ্দিক বলেন, বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থান স্বল্পতার কারণে স্টেশনে ঢোকা ও বেরোনো আরামদায়ক হবে না।

তিনি গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ‘তাই, জনগণের সুবিধার কথা বিবেচনা করে, আমরা স্টেশনগুলোর বাইরে প্রশস্ত ফুটপাত তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

এ জন্য অতিরিক্ত কত টাকা খরচ হবে এম এ এন সিদ্দিক তার বিস্তারিত তথ্য না জানালেও ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে যে অতিরিক্ত ১১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে তার একটি বড় অংশ ব্যয় হবে এই কাজে।

ঢাকা মেট্রো রেল সরকারের ৮টি অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পের মধ্যে একটি। পদ্মা সেতুতে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ১৯২ কোটি টাকা যা দেশে ১ দশমিক ২৬ শতাংশ জিডিপি যোগ করবে। যদি অতিরিক্ত যে অর্থ চাওয়া হয়েছে, তা অনুমোদিত হয়, তাহলে মেট্রোরেল প্রকল্প পদ্মা সেতুর চেয়েও ব্যয়বহুল হবে এবং এর মোট খরচ দাঁড়াবে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশের জিডিপিতে মেট্রো রেলের অবদানও কম হবে না। এটি ঢাকার যানজটকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে। যে যানজটের ফলে বছরে ৫৫ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয় বলে জানিয়েছে এআরআই।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে মেট্রো রেল প্রকল্পের এক কর্মকর্তা বলেন, ডিএমটিসিএলকে ফুটপাথের জন্য জমি কিনতে হবে। স্টেশনগুলোর আশেপাশের বেশিরভাগ জমি ব্যক্তিগত সম্পত্তি।

নকশার শুরুতে প্রশস্ত ফুটপাথ বিবেচনা করা হয়নি কেন জানতে চাইলে সিদ্দিক বলেন, ‘আমাদের দেশে মেট্রো রেল একটি নতুন ধারণা। তাই সবকিছু বুঝতে আমাদের সময় লাগছে। আমরা ট্রায়াল অ্যান্ড এরর থেকে শিক্ষা নিচ্ছি।’

শুধু বিস্তৃত ফুটপাথই প্রকল্পের নকশার একমাত্র সংযোজন নয়। ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুসরণ করে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রো রেল লাইন প্রসারিত করা হবে।

মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র মতিঝিলের সঙ্গে একটি ওয়াকওয়ের মাধ্যমে দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে স্টেশন কমলাপুরকে সংযুক্ত করার কথা ছিল।

এখন ব্যবহারকারীদের সুবিধার্থে কমলাপুরে একটি পূর্ণাঙ্গ স্টেশন তৈরি করা হবে। ফলে মেট্রো রেলের স্টেশনের সংখ্যা হবে ১৭টি।

সিদ্দিকের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।

লাইনের দৈর্ঘ্য এখন ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটারের পরিবর্তে ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার হবে।

মূল পরিকল্পনায় ৪টি স্টেশন প্লাজার অপশন ছিল। জমি অধিগ্রহণে অতিরিক্ত খরচের জন্য কোনো বরাদ্দ করা হয়নি।

ডিএমটিসিএল এখন সেই স্টেশন প্লাজা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা রাজস্ব আয়ে সাহায্য করবে এবং সেই অনুযায়ী তহবিল চাওয়া হয়েছে।

মূল খরচে উত্তরা সেন্টার স্টেশনে ট্রানজিট-ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) হাবের জন্য জমি অধিগ্রহণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু এটি লেআউট এবং রেজিস্ট্রেশন প্রস্তুত করা সহ আরো কিছু কাজের জন্য তহবিল বরাদ্দ করেনি, যা ডিএমটিসিএল এখন চাইছে।

টিওডি হলো এক ধরনের নগর উন্নয়ন যেখানে গণপরিবহনের হাঁটার দূরত্বের মধ্যে আবাসিক, ব্যবসা এবং অবসর সময় কাটানোর যথেষ্ট স্থান থাকে।

সিদ্দিক জানান, এছাড়া, ডলারের উচ্চ বিনিময় হার এবং মূল্য সংযোজন কর ও শুল্ক ব্যয় বৃদ্ধি খরচ বেড়ে যাওয়ার পিছনে অন্যান্য প্রধান কারণ।

কর্তৃপক্ষও প্রকল্পের মেয়াদ দেড় বছর বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছে। তবে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রো রেলের আংশিক কার্যক্রম ডিসেম্বরে শুরু হওয়ার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা অপরিবর্তিত থাকবে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটি সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে বৈঠক করবে।

৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকার সংশোধিত প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ১৯ হাজার ৬৭৫ দশমিক ৭০ কোটি টাকা প্রকল্প সহায়তা থেকে আসবে এবং বাকিটা সরকারি কোষাগার থেকে।

সংশোধিত প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির কাছে পাঠানো হবে।

জাপান থেকে অল্প সুদের ঋণের অর্থায়নে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি অনুমোদন পেলেও ২০১৬ সালের আগে এর মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয়নি।

বর্তমানে, প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ। উত্তরা-আগারগাঁও অংশ এই বছরের শেষের দিকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই অংশের ৯০ শতাংশ কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মেট্রো রেল প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার লোককে বহন করতে সক্ষম হবে। উত্তরা থেকে মতিঝিলের মধ্যে যাতায়াতের বর্তমান সময় প্রায় ২ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৪০ মিনিটে নামিয়ে আনবে।

সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছাড়া বাকি ৭টি ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পই অন্তত একবার করে সংশোধন করা হবে।

তহবিল নিয়ে অনিশ্চয়তা, নকশা নিয়ে জটিলতা, পরিকল্পনা পরিবর্তন এবং জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা ও জবাবদিহিতার অভাব এবং করোনা মহামারিকে বাড়তি সময় ও ব্যয়ের জন্য দায়ী করা হয়।

বর্তমানে উন্নয়ন প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি উদ্বেগের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় এই বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

সূত্র : দ্য ডেইলি স্টার
এন এইচ, ১৩ জানুয়ারি

পদ্মা সেতুর চেয়েও ব্যয়বহুল হতে যাচ্ছে বহুল প্রতিক্ষিত মেট্রো রেল

সূত্রঃ দেশে বিদেশে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: