এসপিদের সঙ্গে বিরোধের অবসান চান ডিসিরা

ঢাকা, ১৫ জানুয়ারি – জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা পুলিশ সুপারদের (এসপি) মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বিরোধ দীর্ঘদিনের। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের স্বার্থে এ বিরোধের অবসান চান ডিসিরা। আগামী মঙ্গলবার শুরু হতে যাওয়া ডিসি সম্মেলনে বিষয়টি তুলবেন তারা। এ ছাড়া রাজনৈতিক তদবির ও চাপ থেকে মুক্ত থেকে কাজ করতে সরকারের সহযোগিতা চেয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। সম্মেলনে ২৭৫টি প্রস্তাব আলোচনার জন্য তোলা হবে।

ডিসি-এসপির দ্বন্দ্বের বিষয়টি বহু পুরনো। অভিযোগ রয়েছে- ডিসির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় অনেক সময় এসপি উপস্থিত হন না। সেখানে জুনিয়র কর্মকর্তারা এসপির পক্ষে উপস্থিত থাকেন। জেলায় প্রতিদিনের মামলা ও জিডির তথ্য ডিসিকে সরবরাহের কথা থাকলেও

সেটি মানেন না এসপিরা। বিষয়টি সুরাহা করতে এসপিদের চিঠিও দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবু কাজ হয়নি। ডিসি-এসপির এমন বিরোধের প্রমাণও পেয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গত বছরের মে মাসে গোপনীয় প্রতিবেদনে জেলার দুই গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার বিরোধ ও মতানৈক্য সংক্রান্ত বেশকিছু তথ্য সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই মতানৈক্যের কারণে জেলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ অন্যান্য কাজে ব্যঘাত ঘটছে। ফলে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে এসপিদের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তি চান ডিসিরা। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য এবারের সম্মেলনে তুলতে চান ডিসিরা।

ডিসি সম্মেলনে আলোচনার জন্য প্রস্তুত করা কিছু কিছু প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে পেরেছে প্রতিবেদক। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বাড়াতে স্থানীয় সব ধরনের ইজারা থেকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি), উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনকে অংশ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন সিলেটের ডিসি। নিজস্ব আয় কম হওয়ায় অনেক উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদে সচিব, হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ও গ্রামপুলিশদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাচ্ছে না। এমনকি চেয়ারম্যান ও সদস্যদেরও সম্মানী-ভাতা দেওয়া যাচ্ছে না বলে প্রস্তাবে যুক্তি দেখানো হয়েছে।

উপজেলা পরিষদের কর্মচারীদের বদলির ক্ষমতার প্রস্তাব করেছেন ঝালকাঠির ডিসি। প্রতি তিন বছর অন্তর জেলা পর্যায়ে আন্তঃউপজেলায় বদলির ক্ষমতা ডিসিকে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে আন্তঃজেলা বদলির ক্ষমতা বিভাগীয় কমিশনারের হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাব করেছেন তিনি। প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলা হয়েছে- কর্মচারীরা দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে চাকরির কারণে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। ফলে অফিসের কাজকর্মে বিঘœ ঘটে এবং প্রশাসনের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। তাদের বদলি করলে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যোগসাজশ কমে যাবে। এতে প্রত্যাশিত সেবা বৃদ্ধি পাবে এবং কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হবে। বর্তমানে তাদের বদলির কোনো বিধান নেই।

দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে মাঠকর্মীর পদ সৃষ্টি করে নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন ভোলার ডিসি। গ্রাম আদালতের বেঞ্চ সহকারী জনবল বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছেন কুষ্টিয়ার ডিসি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সম্মানী বৃদ্ধির প্রস্তাব যশোরের ডিসির। গ্রামপুলিশ ও মহল্লাদারদের বেতন-ভাতা ও আনুতোষিক ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন চট্টগ্রাম, যশোর, বান্দরবান ও বরগুনার ডিসি।

সূত্র জানায়, সারাদেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ডিসি সম্মেলনে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হবে। ইউপি নির্বাচন ঘিরে হত্যা-সংঘর্ষ সরকারকে বেশ বিব্রত করেছে। একই সঙ্গে এলাকার উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিশেষ করে টেন্ডার পাওয়া না পাওয়া কেন্দ্র করে দলীয় কোন্দল সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি রাস্তাঘাট, কালভার্ট বা সেতু নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের মান নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এখনই মাঠপর্যায়ের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ না হলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা অনেকের। এ কারণে এখন থেকেই বিষয়টি কঠোর হাতে দমন করতে চায় সরকার।

বেশ কয়েক ডিসি জানিয়েছেন, প্রতিবছর ডিসি সম্মেলনে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রস্তাব দেওয়া হয়, বাস্তবায়নের আশ^াসও মেলে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয় না। এমনকি বছরের পর বছর উপস্থাপনের পরও কোনো কোনো ইস্যুর সমাধান হয় না।

করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় গত বৃহস্পতিবার থেকে সারাদেশে বিধিনিষেধ জারি করেছে সরকার। এরই মধ্যে মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে তিন দিনের ডিসি সম্মেলন। করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে দুই বছর পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ সম্মেলন। সবশেষ ২০১৯ সালের ১৪-১৮ জুলাই ডিসি সম্মেলন হয়েছে।

এবারের ডিসি সম্মেলন আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান মেয়াদের তৃতীয় সম্মেলন। এই সরকারের মেয়াদে আর একটি সম্মেলন হবে। ফলে এবার নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা নির্দেশনা দেওয়া হবে ডিসিদের। সরকার ইতোমধ্যে নির্বাচন মাথায় রেখে মাঠপ্রশাসন ঢেলে সাজানোর কাজে হাত দিয়েছে। বর্তমানে যারা ডিসি হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন তারা আগামী নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন। সুতরাং এবারের ডিসি সম্মেলন থেকে তাদের সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেবেন প্রশাসনের শীর্ষকর্তারা। আবার নির্বাচনের আগে অনেক এসপিকে তুলে আনা হবে। নতুন যারা এসপি পদে নিয়োগ পাবেন তারা নির্বাচনের সময় দায়িত্ব সামলাবেন।

সাধারণত প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ে ডিসি সম্মেলন উদ্বোধন করেন। এবার ডিসিরা মুক্ত আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীকে পাচ্ছেন না। করোনার কারণে এবার রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সেশনটি হবে ভার্চুয়ালি। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর সঙ্গেও সেশন ভার্চুয়ালি হবে।

রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রথম দিন বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালি সম্মেলন উদ্বোধন করবেন। ওইদিন সন্ধ্যায় ভার্চুয়ালি দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেবেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এ ছাড়া কার্যঅধিবেশনগুলো হবে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে। এতে সভাপতিত্ব করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

সূত্র : আমাদের সময়
এন এইচ, ১৫ জানুয়ারি

এসপিদের সঙ্গে বিরোধের অবসান চান ডিসিরা

সূত্রঃ দেশে বিদেশে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: