সংক্রমণ বাড়লেই রেড জোন, কক্সবাজার দিয়ে শুরু

এখন আর সাধারণ ছুটি ঘোষণার মতো কোনো পদক্ষেপে যেতে চায় না সরকার। তাই করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা যেখানে বাড়বে, সেখানেই ‘রেড জোন’ ঘোষণা করে কঠোর লকডাউনের দিকে যেতে চায়। ইতিমধ্যে কক্সবাজারে গতকাল শুক্রবার ‘রেড জোন’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ইতিমধ্যে আক্রান্তদের ডাটাবেজও তৈরি হয়েছে। সহসাই পদক্ষেপ শুরু হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা পুরো পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করে ফেলেছি। সরকারের দায়িত্বশীলদের কাছে এটা পাঠানো হয়েছে। কক্সবাজারের রেড জোন ঘোষণাটি এই প্রক্রিয়ার অংশ কি না সেটা বলতে পারব না, তবে আমরা তিনটি জোনে ভাগ করার যে পরিকল্পনা করেছি, সেটা এমনই। এখন শুধু কক্সবাজারকে রেড জোন ঘোষণা করলে হবে না। আমরা বলেছি, সারাদেশেই একসঙ্গে এটা বাস্তবায়ন করতে হবে। নির্দিষ্ট এলাকায় করলে হয়তো ঐ এলাকার উন্নতি হবে, তাতে সার্বিক অবস্থার কোনো উন্নতি হবে না। আবার শুধু রেড জোন ঘোষণা করে বসে থাকলে হবে না, এর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। কোনো এলাকা বন্ধ করলে সেখানে সবকিছু পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করতে হবে।’ গতকাল এক ভার্চুয়াল বৈঠক শেষে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন পুরো জেলাকে তিনটি জোনে ভাগ করে কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রেড জোন শনাক্ত করা এলাকায় কেউ ইচ্ছে করলেই প্রবেশ বা বাইরে যেতে পারবেন না। কক্সবাজার পৌরসভার ১২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১০টিকে রেড জোন ও দুইটিকে ইয়েলো জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে প্রতিটি ওয়ার্ডে ৩০ জন করে স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন। তাদের কক্সবাজার সদর উপজেলার ইউএনও মাহমুদ উল্লাহ মারুফ পরিচয়পত্র ইস্যু করবেন। আটটি উপজেলাকে ইউনিয়নভিত্তিক ও চারটি পৌরসভায় ওয়ার্ডভিত্তিক বিন্যাস করে ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। এসব এলাকায় আজ শনিবার থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত লকডাউন বলবত্ থাকবে।

সপ্তাহে রবি ও বৃহস্পতিবার সীমিত সময়ের জন্য কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর দোকান খুলতে পারবে। সেসময় স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে প্রশাসনের কঠোর মনিটরিং থাকবে। একইভাবে কক্সবাজার পৌর এলাকায় অবস্থিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও প্রতি সপ্তাহের রবি ও বৃহস্পতিবার সীমিত সময়ের জন্য খেলা থাকবে। কোনো প্রকার গাড়ি লিংক রোড থেকে পশ্চিম দিকে শহরে আসতে পারবে না। শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালেও প্রবেশ করতে পারবে না। লিংক রোড থেকেই সব গাড়ি ছেড়ে যাবে।

কক্সবাজার জেলার বাইরের কোনো লোককে এই দুই সপ্তাহ প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। গণমাধ্যমকর্মী, সংবাদ সংগ্রহকারী, ক্যামেরাম্যান ও সংশ্লিষ্টদের কক্সবাজার প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ থেকে ইস্যু করা পরিচয়পত্র নিয়ে চলাচল করতে হবে। শহরের মসজিদগুলোতে কর্তৃপক্ষের নির্দেশিত সংখ্যার বেশি মুসল্লি অংশ নিতে পারবেন না। কক্সবাজারে এ পর্যন্ত ৮৮৬ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ১৮ জন। ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প রয়েছে ঝুঁকিতে। ইতিমধ্যে এক জন রোহিঙ্গা মারা গেছেন এবং ৩৪ জন চিকিত্সাধীন রয়েছেন।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বর্তমান উপদেষ্টা ডা. মুস্তাক হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা তো শুরু থেকেই এভাবে কাজ করতে বলছি। এটাই মহামারি নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি। ঢাকার টোলারবাগে বা মাদারীপুরের শিবচরে এটা করে ভালো ফল মিলেছে। এখন এটা না করতে পারলে কিন্তু একসময় পুরো দেশটাই রেড জোন ঘোষণা করা লাগতে পারে। কারণ হঠাৎ করেই সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে ঝুঁকি নেওয়া উচিত হবে না। এটা শুধু হুকুম দিয়ে হবে না, মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রান্তিক মানুষ যারা তাদের ঘরে খাবার পৌঁছাতে হবে। তাদের সামাজিক সহযোগিতা ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা করতে হবে। দেখেন, কার্ফু দিলে কি কোনো লাভ হবে? সেনারা কি কাউকে গুলি করতে পারবে? এটা তো আইনশৃঙ্খলার সমস্যা না, এটা জনস্বাস্থ্যের সমস্যা।’

জানা গেছে, ইতিমধ্যে পুরো দেশের ইউনিয়ন পর্যন্ত ম্যাপিং করে দিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রতিদিন শনাক্ত হওয়া রোগীদের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সফটওয়্যারের মাধ্যমে সারা দেশের চিত্র দেখতে পারছে। এখান থেকে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকাগুলোকে রেড জোন ঘোষণা করা হবে। একটি এলাকার কত বর্গকিলোমিটার জায়গায় কত জন করোনায় আক্রান্ত হলে সেটি রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোন হিসেবে চিহ্নিত হবে, সেই মানদণ্ডও ইতিমধ্যে ঠিক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত হাবিবুর রহমান খান বলেছেন, কতটুকু এলাকায় কত জন শনাক্ত হলে রেড জোন ঘোষণা করা হবে, সেটি নির্ধারণে বিশেষজ্ঞ কমিটির কাজ শেষপর্যায়ে। জানা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি অধ্যাপক, মহামারি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সারা দেশকে জোন ভিত্তিক ভাগ করার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করছেন।

সরকার চেষ্টা করছে কোনোভাবেই যাতে আর রোগীর সংখ্যা না বাড়ে। এই কারণে রেড জোন পর্যায়ক্রমে ইয়েলো জোনে পরিণত হয়ে শেষে যেন গ্রিন জোন হয়। অন্যদিকে ইয়েলো জোন যেন কোনো ভাবেই রেড জোনে পরিণত না হয় এবং গ্রিন জোন যেন ইয়েলো জোন না হয় সেটা নিশ্চিত করা হবে। রেড জোনের বাসিন্দাদের অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। শুধু জীবনধারণের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সহায়তা ছাড়া আর কিছু এই এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছবে না। এখানকার কাউকে বাইরে বের হতে দেওয়া হবে না। ইয়েলো জোনে থাকবে কড়া সতর্কতা।

ইত্তেফাক/কেকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: