সিট নেই শামসুদ্দিন হাসপাতালে, করোনা চিকিৎসা নিয়ে শঙ্কায় দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত

সিলেটে বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহতার দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। সৃষ্টি হয়েছে চিকিৎসা সংকট। এই সংকট মোকাবেলায় স্বাস্থ্য বিভাগকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে নগরীর করোনা ডেডিকেটেড শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ ১ শত শয্যার সরকারি হাসপাতালে এখন সিট সংকটে পড়েছে। বর্তমানে ৮৫ জন রোগী বর্তমানে ভর্তি আছেন এই হাসপাতালে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এখন সিলেটে করেনা চিকিৎসার নির্ভরতা গড়াচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের উপর। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয় বহুল। এই অবস্থায় নিম্ন আয়ের মানুষেরা অসহায় বোধ করছেন। তাই আক্রান্তরা টাকায় অভাবে ঘরেই বেঘোরে মারা পড়বেন। সোমবার সিলেট বিভাগে ৮২ জন আক্রান্ত হয় মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত বিভাগে এ সংখ্যা দাড়ায় ১ হাজার ৬২৮ জনে। এর মধ্যে সিলেট জেলায়ই ৯৩৯ জন। এ পর্যন্ত বিভাগে হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ১৩ হাজার ৬৭০ জন। সিলেট বিভাগে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭-এ।

বিভাগীয় শহর সিলেটে এমনিতেই করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। এর মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষ চিকিৎসা নিয়ে আশঙ্কা ও উদ্বেগ আছেন। করোনা রোগীদের চিকিৎসায় সামসুদ্দিন হাসপাতালে সিট সংকট সম্পর্কে সিলেট সিভিল সার্জন প্রেমানন্দ মন্ডল মঙ্গলবার বিকালে ইত্তেফাককে বলেন, করোনা রোগীদের এখন চিকিৎসা দেবে দক্ষিণ সুরমা নর্থ-ইষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আখালিয়া মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল। তিনি জানান,৩ শত বেডের নর্থ-ইষ্ট মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালের সাথে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কথা চলছে। বিষয়টি ফাইনাল হলে রোগীদের সুবিধা হবে। তবে সর্বশেষ খবর অনুযায়ী চুক্তিটি এগোয়নি। এই এ দুটি হাসপাতালই প্রাইভেট। এতে ব্যয় বেশী। অক্সিজেন বাবদ রোগীকে দৈনিক গুনতে হবে প্রায় ২০ হাজার টাকা। তাই অনেকের পক্ষে প্রাইভেট চিকিৎসা প্রায় অসম্ভব।

করোনা সন্দেহভাজনদের নমুনা পরীক্ষার জন্য নগরীতে আরো কয়েকটি বুথ স্থাপন জরুরী-এই মর্মে গত ২ জুন দৈনিক ইত্তেফাকে সংবাদ প্রকাশ পেলে স্বাস্থ্য বিভাগ, খাদিম ৩১ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও দক্ষিনসুরমা ৩১ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুটি বুথ স্থাপন করলে মানুষ সেবা পাচ্ছেন। কিন্তু খাদিম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এম্বুলেন্স না থাকায় রোগীদের কষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া ওসমানী হাসপাতাল ল্যাবে দ্রুত স্যাম্পল পাঠানো যাচ্ছেনা।

সিলেট ওসামানী হাসপাতাল ও শা‘বিতে দুটি পিসিআর ল্যাব-এ প্রতিদিন প্রায় ২ শত বা তার কিছু বেশী নমুনা পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় পরীক্ষার স্তূপও বাড়ছে। করোনা আক্রান্তের নমুনা বেশীদিন পড়ে থাকলে তা নষ্টও হয়ে যায়। এই অবস্থায় পরীক্ষাও বাড়ানো জরুরী। সূত্র মতে, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পিসিআর ল্যাব-এ পরীক্ষা সম্ভব। সেখানে দৈনিক ৩ শত জনের নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে হবিগঞ্জে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও আরেকটি ল্যাব স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। সিলেট সংক্রামক ব্যাধি ২০ শয্যার হাসপাতালকেও করোনা রোগীদের কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু উদ্যোগ প্রয়োজন। সূত্র জানায় সিলেট টিবি হাসপাতালের পিসিআর ল্যাব-এ এমবিডিসি‘র ডাইরেক্টরের উদ্যোগে করোনার নমুনা পরীক্ষার কাজ অনেকটা এগিয়ে আছে।

‘স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন সিলেট বিভাগের করোনা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য আন্তরিক সদিচ্ছা ও উদ্যোগ প্রয়োজন। যন্ত্রপাতি ও লোকবল তেমন সমস্যা হবেনা’, এই মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট একজন বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগে কাজ করেছেন এমন অভিজ্ঞ অবসর প্রাপ্ত অন্তত: ২০ জন ডাক্তার ও কর্মকর্তা সিলেটে রয়েছেন-যাদেরকে চাইলেই বর্তমান সময়ে কাজে লাগানো সম্ভব। এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, তারা এই দু:সময়ে দেশের জন্য কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছেন।

এদিকে সিলেটে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে অন্তত: চার জনের মৃত্যুর ঘটনায় সোমবার সাংবাদিক সম্মেলনে দু:খ প্রকাশ করে প্রাইভেট হসপিটাল ও ডায়গনস্টিক সেন্টার এসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. নাসিম আহমদ বলেন, এখন থেকে সিলেটের প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে বিনা চিকিৎসায় রোগী ফের যাবেনা। এতে আশার আলো দেখছিলেন অনেকেই। তবে প্রাইভেটে ব্যয় বহুল চিকিৎসার কথা জেনে অনেকেই চুপসে গেছেন। এ প্রসঙ্গে ডা. নাসিম বলেন, শুরু থেকেই নর্থ-ইষ্ট হাসপাতালকে আমরা রেডি করেছিলাম করোনা চিকিৎসার জন্য। সিটি করপোরেশনের মেয়র ও প্রশাসনের আন্তরিকতা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকারের সাথে আলোচনা কেন সফল হয়নি তিনি জানেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন বিভাগীয় ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ যথাযথ ভাবে দ্রুত উদ্যোগ নিলে সিলেটে করোনা আক্রান্তের সেবা আরো ফলপ্রসূ হবে।

এদিকে গত শনিবার সিলেট বিভাগকে করোনার রেড জোন ঘোষণা করা হয়। তার পরও মানুষের মধ্যে সচেতনতা নেই বললেই চলে।তবে অবস্থা বেগতিক দেখে গতকাল মঙ্গলবার সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সহ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা নগরীতে অভিযান চালান। মেয়র আরিফ বলেন, আমরা মানুষকে এভাবে মরতে দিতে পারিনা। তাই অভিযান। হকার্স মার্কেট ও হাসান মার্কেট এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখা হবে।

মঙ্গলবার ভ্রাম্যমাণ আদালত, রাস্তায় মাস্ক না পরা, নিয়ম না মেনে গণ পরিবহণে অতিরিক্ত যাত্রী বহনসহ করোনা প্রতিরোধে সরকারের বিভিন্ন নিয়ম ভাঙ্গার দায়ে জরিমানা করে ১ লাখ ২০ হাজার ৫০ টাকা। মামলা দায়ের করা হয়েছে ২৬৯টি। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম মুস্তাফিজুর রহমান জানান, অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ইত্তেফাক/আরএ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: