বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকিতে সাত গ্রামের মানুষ

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালী এলাকায় ওয়াটা কেমিক্যাল কারখানার বিষাক্ত গ্যাসে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন সাত গ্রামের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ।

বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে মরে যাচ্ছে এলাকার গাছ ও পুকুর-খামারের মাছ। নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি। ছড়াচ্ছে নানা রোগ। গত এক মাসে প্রায় অর্ধ শতাধিক শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধ অসুস্থ হয়েছেন। ঘনবসতি এলাকা থেকে কারখানাটি অপসারণ করার জন্য স্থানীয়রা একাধিকবার মানববন্ধন-বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করলেও কোনো ফল হয়নি।

প্রতিবাদ করতে গিয়ে চাঁদাবাজির মামলার শিকার হয়েছেন অনেকেই। গতকাল মঙ্গলবার সকালেও স্থানীয় এলাকাবাসী কারখানাটি অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মঙ্গলখালীর জনবহুল এলাকায় ওয়াটা কেমিক্যাল কারখানাটি স্থাপন করা হয়েছে। এ কারখানায় সালফিউরিক এসিড ও অ্যালুমোনিয়াম এসিডসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল তৈরি করা হয়। এসব এসিডের বিষাক্ত গ্যাস এলাকায় ছড়িয়ে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়াসহ নানা ধরনের জটিল রোগ দেখা দিচ্ছে।

মঙ্গলখালী, ফরিদআলীরটেক, কাটাখালী, মোকিমনগর, পাবই, ঠাকুরবাড়ীর টেক ও বানিয়াদি এলাকার মানুষ দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন কারখানার বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে দেওয়া হয়। আর তা বাতাসে ছড়িয়ে পুরো এলাকার পরিবেশ বিষিয়ে তুলছে।

মোকিমনগর এলাকার জুনায়েত (১২) মুড়াপাড়া পাইলট স্কুলের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে জানায়, গত ২ জুলাই স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বিষাক্ত গ্যাস তার নাকমুখ দিয়ে প্রবেশ করতেই শ্বাসকষ্ট, কাশি ও গলা ব্যথা ওঠে। পরে পরিবারের লোকজন তাকে নেবুলাইজার ব্যবহার করে ও ওষুধ খাইয়ে সুস্থ করে।

মঙ্গলখালী এলাকার সেলিম খানের স্ত্রী সুলতানা বেগম জানান, ওয়াটা কেমিক্যালের গ্যাসে তিনি নিজে এবং তার ছেলে অসুস্থ হয়েছেন। প্রতিবাদ করলে মালিকপক্ষের লোকজন নানাভাবে হুমকি দেয়। একই এলাকার তাজুল ইসলামের স্ত্রী সুমি আক্তারের অভিযোগ, বিষাক্ত গ্যাসে তাদের ১২ শতাংশ জমির ধানসহ বাড়ির নারিকেল, পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফলদ গাছ মরে গেছে।

ওয়াটা কেমিক্যাল কারখানার বিষাক্ত গ্যাসে অসুস্থ হওয়ার ভয়ে এলাকা ছেড়ে ঢাকার কাজলা, ডেমরাসহ বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছে ২৫ থেকে ৩০টি পরিবার। প্রতিবাদ করতে গিয়ে এরই মধ্যে অনেকে মামলা-হামলা, নির্যাতন ও হুমকির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মঙ্গলখালী এলাকার নুর মোহাম্মদের ছেলে সাদ্দাম হোসেন বলেন, প্রতিবাদ করায় আমাকেসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে ২ কোটি টাকার চাঁদাবাজি মামলা দেওয়া হয়। এ কারণে এখন প্রতিবাদ করতে সাহস পাই না। স্থানীয়দের দাবি, কারখানাটি এখানে স্থাপন করার সময়ই তাদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কারখানাটি চালু করা হয়।

এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাইদ আল মামুন জানান, জনবসতি এলাকায় এমন কারখানা থাকাটা ঠিক নয়। এখানকার গ্যাসের কারণে মানুষ ফুসফুসে প্রদাহ, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে কারখানার জেনারেল ম্যানেজার আবু তাহের ভুইয়া বলেন, এলাকাবাসীর অভিযোগ সত্য নয়। আমাদের গ্যাসে কারো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কারণ কারখানায় ইটিপি প্ল্যান্ট রয়েছে। স্বার্থান্বেষী মহল সুবিধা নিতে এ নিয়ে কথা বলছে।

জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ার বলেন, এ কারখানার ছাড়পত্র রয়েছে। তবে যদি এলাকাবাসীর ক্ষতি হয় আর এলাকাবাসী যদি লিখিত অভিযোগ করেন তাহলে তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে ছাড়পত্র বাতিলের সুপারিশ করা হবে।

ইত্তেফাক/জেডএইচ

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: