‘নূরুদ্দিনের পাখিবাড়ি’

চারপাশে বৃষ্টিভেজা নাম-না-জানা হরেক গাছগাছালি। আকাশছোঁয়া বাঁশবাগান। পানিতে ভাসমান সবুজ কচুরিপানা। এর ভেতরে এক বাড়ি।

কাছাকাছি গেলেই শোনা যায় পাখির কলকাকলি। একটু ভালো করে তাকালেই চোখে পড়ে সবুজ পত্রপল্লবে নিশ্চিন্তে উড়ে বেড়াচ্ছে শ্বেতশুভ্র বলাকাসহ নানা রঙের পাখি।

খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের ফ্রেমে ঘেরা দৃষ্টিনন্দন এক বাড়ির চারপাশে গড়ে উঠেছে পাখিদের এই নিরাপদ বিচরণ ক্ষেত্র। গড়ে উঠেছে ‘নূরুদ্দিনের পাখিবাড়ি’।

সিলেট শহর থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে ছালিয়া গ্রামে পাখিদের এই অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছেন নূরুদ্দিন নামে এক প্রকৃতিপ্রেমী। প্রায় তিন একর জমি নিয়ে তৈরি এ বাড়ি। বাড়ির নাম ‘নূর-আনোয়ারাবাদ’ রাখা হলেও এলাকায় ‘নূরুদ্দিনের পাখিবাড়ি’ নামেই এটি পরিচিত।

বাড়ির প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই ডান পাশে চোখে পড়ে হরিণের ঝাঁক। নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে হরিণগুলো। কেউ গেলে উঁকিঝুঁকি মারে। তারপর আবার তারা আপন ভুবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে বাড়িতে পাখিরই প্রাধান্য বেশি। চারিদিকে শুধু পাখি আর পাখি। এখানে সাদা বকই আছে বেশি। পানকৌড়িও রয়েছে। আছে তিতির পাখি, কবুতরও।

গাছের ওপর পাখির বাসায় কোনোটিতে রয়েছে ডিম। কোনোটিতে বাচ্চা নিয়ে বসে আছে মা-পাখি। সুপারি গাছগুলোতে বাবুই পাখির বাসাবাড়িটির সৌন্দর্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। গ্রামীণ পরিবেশ তৈরি হলেও বাড়িটিতে রয়েছে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা।

বাড়ির সামনেই রয়েছে শানবাঁধানো ঘাটসহ চমত্কার একটি পুকুর। পুকুরে লম্বা লম্বা বাঁশ পানিতে পুঁতে রাখা হয়েছে ক্লান্ত পাখিরা যেন উড়ে এসে বসতে পারে শীতল পরিবেশে। ব্যক্তি উদ্যোগে পাখিদের এমন অদ্ভুত সুন্দর অভয়ারণ্য নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

বাড়ির মালিক এমদাদুল হক জানালেন, তার বাবা নূরুদ্দিন প্রায় ২০ বছর আগে এই বাড়িটিকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলেন। তিনি বাজারে গেলেই পাখি কিনতেন। আর সেগুলো বাড়িতে এনে ছেড়ে দিতেন। ‘পাখির জায়গা খাঁচায় না, মুক্ত আকাশে’—এই দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন নূরুদ্দিন। ছেড়ে দেওয়া অনেক পাখি উড়ে যেত বহু দূরে। পরে কিছু পাখি ফিরে আসত নূরুদ্দিনের ছায়াঘেরা বাড়িতে। পাখিগুলো আশ্রয় নিত উঁচু গাছগাছালিতে। যত্ন-আত্তি পেয়ে পাখিগুলো নীড় গড়ে নিয়েছে নূরুদ্দিনের সবুজঘেরা বাড়িতে। এভাবেই ধীরে ধীরে বংশবৃদ্ধি হয় পাখিরাজ্যে। পাখিদের নিরাপত্তায় নূরুদ্দিন পাহারা বসান। পাখি চুরি কিংবা শিকার ঠেকাতে নূরুদ্দিন নিজেই প্রহরী যেতেন অনেক সময়।

পাখিপ্রেমিক নূরুদ্দিন আজ বেঁচে নেই। ২০০৪ সালে তিনি তার শখের পাখি রেখে চলে যান না ফেরার দেশে। তবে নূরুদ্দিনের ছেলে এমদাদুল হক প্রকৃতিপ্রেমী বাবার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। নিয়েছেন পাখিগুলোর দেখাশোনার দায়িত্ব।

তিনি জানালেন, শীতের অতিথি পাখিও ভিড় জমায় সেখানে। সারাদিন পাখিগুলো যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ালেও বেলাশেষে আপন নীড়ে ফিরে আসে। ব্যবসায়ী এমদাদুল জানান, তার তিন সন্তান শহরের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করে। তারাও এই পাখি নিয়ে পরম আনন্দে সময় কাটায়। প্রায়ই শহর বা দূর থেকে পাখিপ্রেমীরা আসেন নূরুদ্দিনের পাখিবাড়ি দেখতে।

ইত্তেফাক/জেডএইচ

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: