নাগেশ্বরীতে বন্যায় পানিবন্দী মানুষ, নদী ভাঙ্গনে বিলীন ঘর-বাড়ি

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে একটানা ২৬ দিন ধরে পানির নিচে রয়েছে ১০ ইউনিয়নের ৫৫ টি গ্রাম। করোনা, বন্যা ও ভারি বৃষ্টিপাতে দুর্বিসহ হয়ে পড়েছে বানভাসি ৬ হাজার ৫৭০ পরিবারের প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের জীবন। দুধকুমর ও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে ২০৫ পরিবারের ঘর-বাড়ি।

ভারি বৃষ্টিপাত ও উজানের পাহাড়ি ঢলে ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমর, ফুলকুমর, গঙ্গাধর ও শংকোষসহ সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে গত জুন মাসের ২৬ তারিখ লোকালয়ে প্রবেশ করে। প্লাবিত হয় বামনডাঙ্গা, বেরুবাড়ী, কালীগঞ্জ, ভিতরবন্দ, নুনখাওয়া, নারায়ণপুর, কচাকাটা, কেদার, বল্লভেরখাষ ও রায়গঞ্জ ইউনিয়ন। এরপর কখনও বন্যার উন্নতি, কখনও অবনতি। এ অবস্থায় কেটে গেছে ২৬ দিন। সর্বশেষ সোমবার রাত থেকে পানি কমতে শুরু করলেও এখনো জাগেনি ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট। লোকালয়ের দৃশ্যপটেরও কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ঘরে-বাইরে অথৈ পানি। কিন্তু খাবার বিশুদ্ধ পানি মিলছে না অনেক এলাকায়। তা আনতে হচ্ছে অনেক দূর থেকে। কারণ এ বন্যায় তলিয়ে গেছে ৪২১০ টি টিউবওয়েল। ভাসা পানিতে কলাগাছের ভেলায় চুলা বসিয়ে চলছে রান্নার কাজ। এতেই চলছে দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের যোগান। উঁচু মাচা, খাটের ওপর খাট অথবা চৌকির ওপর চৌকি দিয়ে সন্তান-সন্ততি নিয়ে কোনমতে রাত্রিবাস। কাছে কিংবা দুরে কোথাও উঁচু জায়গায় রাখা হয়েছে গৃহপালিত পশু-পাখি। সেখান থেকে সাঁতরে অন্য কোথাও চলে যাওয়ায় হারিয়ে গেছে অনেক হাঁস। হারিয়ে গেছে মুরগী।

আরও পড়ুন: বন্যা ও নদী ভাঙ্গন কবলিতদের পাশে চিফ হুইপ

পানির নিচে তৃণভূমি, ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে শুকনো খড় তাই বেঁধে রাখা গরু ছাগলগুলো খাবারের অভাবে অনবরত ডাক দিয়েই চলছে। এখনও রাস্তা-ঘাটের ওপর দিয়ে অনেক উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হওয়ায় ভেঙ্গে পড়া অবস্থায়ই আছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। ইতিমধ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় ভেঙ্গে গেছে ১৪ কিলোমিটার রাস্তা। বাড়ি ভেঙেছে ২০৫ পরিবারের। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮২০ জন লোক। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে মৎস্য ও কৃষি খাতে। ৬৬৪ টি পুকুর তলিয়ে ভেসে গেছে ১ কোটি ৬৫ লক্ষ ৪২ হাজার টাকা মূল্যের ১শত ২৮.৭৮ মে. টন মাছ ও ৪৩ লক্ষ পোনা। নিমজ্জিত হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে ১০০ হেক্টর রোপা আমন বীজতলা, ১২০ হেক্টর আউশ ধান ও ৫৫ হেক্টর জমির সবজি ক্ষেত।

এদিকে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় বাড়ছে ত্রাণের চাহিদা। অনেক এলাকায় বানভাসিদের মাঝে এখনও ত্রাণ সহায়তা পৌঁছায়নি। এমন একটি গ্রাম উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের সেনপাড়া ও পৌরসভার পুর্ব সাঞ্জুয়ারভিটা গ্রাম।

এ এলাকার মধুসুদন সেন, সুবল চন্দ্র, শহিদুল ইসলাম, হামিদুল ইসলামসহ অনেকেই জানান, তারা এ পর্যন্ত বানভাসিদের জন্য বরাদ্দ কোন ত্রাণ সহায়তা পাননি। এ অবস্থা অনেক এলাকার।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোখাখারুল ইসলাম জানান, ইতিমধ্যে পরপর দুই দফায় বানভাসিদের মাঝে ৯৬ মে.টন চাউল, নগদ ৮ লক্ষ ১০ হাজার টাকা ও ৬শত প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ১ লক্ষ ৫৫ হাজার টাকায় ৩৮০ পরিবারের শিশু প্রতি ১ প্যাকেটে ৫০০ গ্রাম গুড়া দুধ, ১ কেজি চিনি ও ১ কেজি করে সুজি বিতরণের প্রস্তুতি চলছে। গো-খাদ্যের জন্য ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। যা দিয়ে চাহিদার সংকুলান না হওয়ায় আরও বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে পেলে বিতরণ করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুর আহমেদ মাছুম জানান, আমরা ইতিমধ্যে যা বরাদ্দ পেয়েছি তাৎক্ষণিক তা বানভাসি মানুষের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। আরও বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। পাওয়া মাত্রই তা বিতরণ করা হবে।

উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তফা জামান জানান, চাহিদার তুলনায় সরকারি বরাদ্দ কম পাওয়ায় তা সব এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে আমি ব্যক্তি উদ্যোগে বিভিন্নভাবে চাউল, ডাল, শুকনো খাবার সংগ্রহ করে প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন এলাকায় বানভাসিদের মাঝে নিজ হাতে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।

ইত্তেফাক/এএএম

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: