পাহাড়ি ঢলে তাহিরপুরে ৩য় দফা বন্যা

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্ত লাগোয়া যাদুকাটা নদীর মূল উৎপত্তি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের জৈন্তিয়া পাহাড়ে। বর্ষায় ভারতে ভারি বর্ষণ হলেই এর প্রভাব পড়ে যাদুকাটা নদীর ওপর।

চলতি বর্ষায় ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্ত নদী দিয়ে পাহাড়ি ঢলের সৃষ্ঠি হয়। সেই সাথে জেলার হাওর বেষ্টিত নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়ে গৃহবন্দী হয়ে পড়েন মানুষ। শুরু হয় সীমাহীন দুর্ভোগ।

সাম্প্রতিক সময়ের দ্বিতীয় দফা বন্যার দুর্ভোগ পোহাতে না পোহাতেই তৃতীয় দফা বন্যার অশুভ সংকেত দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে ঢলের পানিতে নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৭০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বসত বাড়িতে পানি ওঠার কারণে মঙ্গলবার সকাল থেকেই তাদের ঘরে রান্নাবান্না হচ্ছে না। শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।

গত রবিবার থেকে তিনদিন ব্যাপী ভারি বর্ষণের ফলে পাহাড়ি নদী যাদুকাটা উপচে বিপৎসীমার তিন সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তাহিরপুর উপজেলায় কর্মরত পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী এমরান হোসেন। ফলে গ্রামীণ অবকাঠামো ও রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। উপজেলাও বিভিন্ন ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্থান থেকে জেলা শহরের সাথে সড়ক পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে।

বন্যায় আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে হাওরাঞ্চলের প্রায় দু’শ পরিবার । নদী ও হাওরের পানি দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মঙ্গলবার সকাল থেকেই বন্যাশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে বানবাসি লোকজনের আগমন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুব্রত দাস।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ১৮হাজার ২৭০ পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে পানিতে তলিয়ে তাহিরপুর-বাদাঘাটসড়ক,তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স,আনোয়ারপুর বাজার,উপজেলা সদরের তাহিরপুর বাজার হইতে ঠাকুর হাটি আখঞ্জি বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা, তাহিরপুর থানা সম্মুখ হতে রায়পাড়া রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

এছাড়াও যাদুকাটা নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোর বসত বাড়িগুলো ৩ থেকে ৪ ফুট পানির নিচে তলিয়েছে। তাহিরপুর লামা বাজার, শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের নতুনবাজার ও শ্রীপুর বাজার ৩ফুট পানির নিচে রয়েছে।

অপরদিকে তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের আনোয়ারপুর সেতুর পূর্বাংশের এপ্রোচ নির্মাণাধীন রাস্তাটি ৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শনিবার সকাল থেকেই তাহিরপুর সুনামগঞ্জ সড়কে সকল প্রকার যানবাহন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

আরও পড়ুন: উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকায় করোনা থামার লক্ষণ নেই!

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বালিজুড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণকূল,আনোয়ারপুর, পাতারি, তিওরজালাল,লোহাচুরা,বড়খলা,মাহতাবপুর বাদাঘাট ইউনিয়নের ঘাগড়া,ঘাগটিয়া,পাঠানপাড়া,গড়কাটি উত্তর বড়দল ইউনিয়নের রজনীলাইন, রাজাই, শান্তিপুর, চানপুর, দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের পুরান খালাস, সাদেরখলা, চতুর্ভজ, কাউকান্দি, জামলাবাজ তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের জামালগড়, চিকসা, গোবিন্দশ্রী, গাজীপুর, টাকাটুকিয়া দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের মারালা,সুলেমানপুর, নায়ানগর, রাজধরপুর, পৈন্ডপ, নোয়াগাঁও, সন্তোষপুর, ভবানীপুর, ইকরামপুর, পাঠাবুকা, লামাগাঁও, দুমাল, ভবানীপুর। শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের, বাগলী, দুদের আউটা, ইন্দ্রপুর ও মন্দিয়াতার ৬০টি গ্রাম।

রামসিংহপুর গ্রামের খোকন মিয়া,আনোয়ারপুর বাজারের ব্যবসায়ী মিলন,দক্ষিণকুল গ্রামের বাসিন্দা স্মৃতি বর্মণ (৩৫) জানান, তার পরিবারের সদস্যসহ নিয়ে সকাল ও দুপুরে চিড়া আর গুড় খেয়ে খাবারের চাহিদা মিটিয়েছেন।

তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইউএইচএফপিও ডা. ইকবাল হোসেন জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকেই তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আঙিনাটি দুই ফুট পানির নিচে পড়েছে।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পদ্মাসন সিংহ বলেন, ‘উপজেলা দুর্যোগ কমিটির জরুরি সভা করেছি। পাহাড়ি ঢলের পানিতে তাহিরপুরের গ্রামীণ অবকাঠামো অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষের বাড়িঘরে পানি উঠছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ সহায়তা শুকনো খাবার,পানি বিশুদ্বকরন টেবলেট,স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।’

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, ‘তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ বানভাসি মানুষের পাশে রয়েছে। বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। সেই সাথে শুকনো ও রান্না করা খাবার এবং ত্রাণ সহায়তাসহ প্রয়োজনীয় সকল প্রকার সহায়তা করছে।’

বেসরকারি এনজিও সংস্থা ও বিত্তশালীদেরকে বানভাসি মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

ইত্তেফাক/এএএম

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: