বন্যায় এখনো পানিবন্দি লাখ লাখ মানুষ

দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না, বরং কিছু কিছু এলাকায় পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। শরীয়তপুর, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলায় ২০ লাখেরও বেশি মানুষ এখনো পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। বাড়িঘর থেকে পানি নামছে না, এখনো পানিতে ডুবে আছে খেতের ফসল। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ।

ঢাকা-শরীয়তপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এই দুই জেলার মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, পদ্মা নদীর পানি এখনো শরীয়তপুরে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার পানিতে জেলার ৩৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে অন্তত সাড়ে ৩ লাখ মানুষ।

ঢাকা-শরীয়তপুর সড়কের ১৫টি স্থান বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে ঢাকার সঙ্গে শরীয়তপুরের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পদ্মা ও মেঘনা নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে চারটি ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যে কারণে নরসিংহপুর ও হরিনা ঘাটে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। আটকা পড়েছে আট শতাধিক যানবাহন।

নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে পানি উঠে যাওয়ায় রোগী ও তাদের স্বজনদের এবং ডাক্তার-নার্সসহ হাসপাতালের লোকজনদের সমস্যা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, নড়িয়ার ১৪টি, জাজিরার ১২টি, সদরের আটটি ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ৩৫০টি গ্রামে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। বৃহস্পতিবার পদ্মার পানি নড়িয়ার সুরেশ্বর পয়েন্টে কমলেও বিপত্সীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

শুক্রবার শরীয়তপুরের জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বন্যায় পানিবন্দি ১৫০টি পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়। পুলিশ সুপার এস এম আশ্রাফুজ্জামান বানভাসি মানুষের হাতে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন। শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক কাজী আবু তাহের জানান, পানিবন্দি ৪৭ হাজার পরিবারের জন্য চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২ হাজার পরিবারকে শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুরে যমুনার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সকালে মাদারগঞ্জ উপজেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে গিয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়। ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয় ৫০টিরও বেশি কাঁচাপাকা ঘর। যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ১১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল বিপত্সীমার ১০৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এছাড়া পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো.আবু সাঈদের কাছ থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। জেলায় গত প্রায় ২৫ দিন যাবত্ ১০ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, বন্যায় উপজেলার দুপ্তারা, উচিত্পুরা, মাহমুদপুর, ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের পুকুর থেকে ভেসে গেছে অন্তত দেড় কোটি টাকার মাছ।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, যমুনা নদীর পানি ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল শুক্রবার সকালে সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষাবাঁধের হার্ডপয়েন্টে বিপত্সীমার ৭৬ সেন্টিমিটার ও কাজীপুর পয়েন্টে বিপত্সীমার ৮৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই বন্যায় সিরাজগঞ্জ সদর, কাজীপুর, বেলকুচি, চৌহালী, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়ার প্রায় ২৫০টি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ডুবে গেছে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, খেতের ফসল। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। খাবার, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন পানিবন্দিরা। পানি যত বাড়ছে বিভিন্ন স্থানে তত তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ডক্টর ফারুক আহম্মদ জানান, বন্যার্তদের জন্য ২৬৭ মেট্রিক টন চাল, ৩ হাজার ৯৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার ছাড়াও শিশুখাদ্য এবং গবাদিপশুর খাদ্যের জন্য ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, যমুনা ও বাঙ্গালী নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সারিয়াকান্দিতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। গতকাল দুপুরে যমুনায় পানি বিপত্সীমার ১১৪ সেন্টিমিটার এবং বাঙ্গালী নদীতে পানি বিপত্সীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বন্যায় উপজেলার ৯৫টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, পাবনার চাটমোহরসহ চলনবিল অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল, ছাইকোলা, নিমাইচড়া, বিলচলন ইউনিয়নের অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শত শত ঘরবাড়ি, আশ্রয়কেন্দ্র ও গুচ্ছগ্রাম, রোপা আমন ধান, বীজতলা ও ২০০ পুকুর বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। মত্স্যচাষিরা নেট জালের ঘের দিয়ে পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়া ঠেকানোর চেষ্টা করলেও তেমন কাজ হচ্ছে না। বাজারে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে নেট জাল। বন্যার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন খামারিরা। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষকে আশ্রয় দিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (ফ্লাড সেন্টার) খুলে দেওয়া হয়েছে।

ফরিদপুর (পাবনা) প্রতিনিধি জানান, পাবনার ফরিদপুর উপজেলার বৃলাহিড়িবাড়ী, পুঙ্গলী ও ডেমরা ইউনিয়নের আটটি পাকা রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে, সহস্রাধিক বসতবাড়ি, ১২টি বিদ্যালয়ে পানি উঠেছে, প্রায় ৮০০ একর জমির আমন ধান ডুবে গেছে। বৃলাহিড়িবাড়ী ইউনিয়নের পাফরিদপুর-দেওভোগ রাস্তার দুটি ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রৌমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। দুই উপজেলার প্রায় ২ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বেশ কিছু বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, কুড়িগ্রামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়ে শুক্রবার বিপত্সীমার ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। রৌমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আল ইমরান বলেন, পানিবন্দি মানুষের মধ্যে জিআরের চাল, শুকনো খাবার বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) সংবাদদাতা জানান, ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে সরাইলের অরুয়াইল, পাকশিমুল, পানিশ্বর, চুন্টা, শাহজাদাপুর, নোয়াগাঁও ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। খেতের ফসল, মুরগির খামার, পুকুর, বেশ কিছু পাকা সড়ক ডুবে গেছে পানিতে।

সিলেট অফিস জানায়, সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যার পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও কানাইঘাটে সুরমা এবং ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি এখনো বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুক্রবার সকালে কানাইঘাটে সুরমার পানি বিপত্সীমার ২৪ সেন্টিমিটার এবং ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপত্সীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জেলা সদরের সঙ্গে অনেক উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

বরিশাল অফিস জানায়, দেশের চলমান বন্যার এবং উজানের পানির চাপের কারণে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বেশির ভাগ নদনদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রবল স্রোতের মুখে নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ভাঙনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শুক্রবার বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর পানি বিপত্সীমার ৯ সেন্টিমিটার, হিজলার ধর্মগঞ্জে নদীর দুই সেন্টিমিটার, ভোলার দৌলতখানে সুরমা-মেঘনা নদীর পানি ৪৯ সেন্টিমিটার, ঝালকাঠির বিষখালি নদীর পানি ৭ সেন্টিমিটার, বেতাগীর বিষখালী নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার ও বামনার বিষখালী নদীর পানি ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়াও বেশির ভাগ নদনদীর পানিই বিপত্সীমার কাছাকাছি উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মাসুম জানিয়েছেন, উজানের পানির চাপের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের নদনদীর পানি কিছুটা বেড়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরিশালের হিজলা, মুলাদীর বিভিন্ন নদীসহ বানারীপাড়া-উজিরপুরের সন্ধ্যা, মেহেন্দিগঞ্জের কালাবদর ও তেতুলিয়া এবং ঝালকাঠির রাজাপুরের বিষখালী নদীতীরবর্তী এলাকায় কিছুটা ভাঙন দেখা দিয়েছে।

সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, ফরিদপুরের সদরপুর পয়েন্টে প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পদ্মা-আড়িয়াল খাঁয় বন্যার পানি গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার ৬ সেন্টিমিটার কমলেও গতকাল শুক্রবার ৪ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপত্সীমার ১.০৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ফলে চরাঞ্চলের পাঁচটি ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে।

ইত্তেফাক/কেকে

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: