কক্সবাজার বিমানবন্দর রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম পেয়েছে আইএমইডি

কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম পেয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন (আইএমইডি) বিভাগ। এ প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নে নানা ধরনের অনিয়ম পেয়েছিলো ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি। এরপর তা তদন্তের জন্য তারা আইএমইডিতে পাঠায়। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সংস্থাটির রিপোর্টে নানা অনিয়ম ধরা পড়ে। দৈনিক ইত্তেফাকের কাছে আইএমইডির ওই রিপোর্টটি এসেছে।

আইএমইডি তাদের রিপোর্টে বলেছে, রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানটির মাত্র নয় বছরের অভিজ্ঞতা ছিলো। এছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যেসব ডকুমেন্ট জমা দিয়েছিলো সেগুলোর ইংরেজি অনুবাদ নোটারি করা ছিলো না। যে কারণে চীনা ভাষা থেকে ইংরেজি অনুবাদের অর্থ অনেকের কাছে বোধগম্য নয়। শুধু তাই নয়, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংক কর্তৃক কালো তালিকাভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানকে এ কাজের জন্য মনোনীত করা হয়েছিলো। প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকায় ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

আইএমইডি প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রস্তাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যেসব অনিয়ম দেখতে পেয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- প্রস্তাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন কমিটি ‘পোস্ট কোয়ালিফিকেশন’ সম্পাদন না করা। এক্ষেত্রে কমিটি চলমান করোনা পরিস্থিতির অজুহাত দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবে দাখিলকৃত বিভিন্ন আর্থিক ও কারিগরি দলিলপত্রও যাচাই করা হয়নি। পিপিআর অনুযায়ী মন্ত্রীসভায় যে কোম্পানিটির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিলো সেটির বার্ষিক টার্নওভারও যাচাই করেনি মূল্যায়ন কমিটি। উল্লেখ্য, পিপিআর এর যে কোন ধারা লঙ্ঘন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর প্রকল্পটির দরপত্র আহবান করা হয়। দরপত্র প্রস্তাবগুলো মূল্যায়নের পর চীনা প্রতিষ্ঠান সিআরসিসি হারভার-সিসিইসিসি’র নাম ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটিতে পাঠানো হয়। কিন্তু প্রস্তাবটি পাশ না করে কমিটি তা আইএমইডিতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। আইএমইডি তাদের তদন্ত রিপোর্ট মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠায়। এর অনুলিপি দেয়া হয় বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তা আবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে পাঠানো হয় মূল্যায়নের জন্য। আইএমইডি যেসব অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছে সেগুলো সঠিক নয় বলে বেবিচক আবার মন্ত্রণালয়ের কাছে রিপোর্ট দিয়েছে। অথচ মূল্যায়ন রিপোর্ট বেবিচকের কাছে যাওয়ার কথা ছিলো না।

আইএমইডির রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, কক্সবাজার বিমানবন্দর প্রকল্পের মূল্যায়ন কমিটির সদস্যসচিব ছিলেন বেবিচক এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান। তিনি প্রস্তাবের বিভিন্ন নেতিবাচক বিষয় জেনেও তা মন্ত্রীসভা কমিটিতে পাঠিয়েছেন। আইএমইডি বলেছে, প্রকল্প দরপত্র চূড়ান্তের সময় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন মানেননি তিনি। মানা হয়নি সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের ধারা। পোস্ট কোয়ালিফিকেশন ছাড়াই সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচন করা হয়েছে। করোনার অজুহাত দেখিয়ে দরদাতার দাখিল করা দলিল সঠিক কিনা তাও যাচাই করা হয়নি। দরদাতার ব্যাংকিং টার্নওভার সংক্রান্ত ডকুমেন্ট যাচাই করা হয়নি।

এদিকে, বেবিচক সূত্র জানিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাতটি বিমানবন্দরের উন্নয়নের দায়িত্বে রয়েছেন। প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে। এর আগে কক্সবাজার বিমানবন্দরের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালে হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠলে তা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সেখান থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তারো আগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দুর্নীতি, অযোগ্যতা এবং খামখেয়ালির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে তাকে কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব না দিতে বেবিচককে বলা হয়।

এদিকে আইএমইডির রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রস্তাব যাচাই বাছাইয়ের সময় এ ধরনের অভিযোগগুলো কমিটির কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু কমিটি এসব অভিযোগ যাচাই বাছাই করেনি। এছাড়া দরপত্র প্রস্তাবের পোষ্ট-কোয়ালিফিকেশন বাধ্যতামূলক হলেও এক্ষেত্রে তা মানা হয়নি-যা পিপিআর-২০০৮ এর লঙ্ঘন।

এর আগে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটির বৈঠকে বলা হয়েছে যে, বিভিন্ন দেশে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কাজ করার সময় নানা ধরনের অনিয়মে যুক্ত থাকার দায়ে সিআরসিসি হারবারকে কালো তালিকাভূক্ত করেছে বিশ্বব্যাংক। এছাড়া ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি সমগ্র প্রস্তাব পর্যালোচনা করে মূল্যায়ন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম পেয়েছে বলে আইএমইডি সূত্র জানিয়েছে। অনুমোদিত মূল্যায়ন কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে যুগ্ম-সচিব (প্রশাসন) কে মূল্যায়ন কমিটির সদস্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিলো। কিন্তু অদৃশ্য কারণে হঠাৎ করেই অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে দিয়ে মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। মন্ত্রীসভা কমিটির একজন সদস্য বলেন, অতিরিক্ত সচিবকে মূল্যায়ন কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে আগেই কমিটির সংশোধিত গঠন আদেশ জারি করা অত্যাবশ্যকীয় ছিলো। এমতাবস্থায় এ কমিটি দিয়ে মূল্যায়িত যে কোন প্রস্তাব আইন ও বিধি বহির্ভুত তথা অবৈধ।

উল্লেখ্য, রাজধানীসহ অন্যান্য শহরের সাথে যোগাযোগ নিবিড় করার লক্ষ্যে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করার প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রকল্প সারপত্রে দেখা যায়, বর্তমানে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য নয় হাজার ফুট। এটিকে মহেশখালী চ্যানেলের দিকে আরো ১৭’শ ফুট সম্প্রসারণ করা হবে। অন্যান্য রানওয়ের সম্প্রসারণের চেয়ে এ কাজটি অত্যন্ত জটিল। কারণ সম্প্রসারিত রানওয়ের সিংহভাগই থাকবে সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপর। ১৯’শ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।

ইত্তেফাক/আরএ

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: