হাসপাতালের সরকারি ওষুধ আত্মসাতের সময় হাতেনাতে ধরা নার্স

ভোলার বোরহানউদ্দিনে হাসপাতালের সরকারি ওষুধ অবৈধভাবে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে স্থানীয় লোকজনসহ সংবাদকর্মীদের ক্যামেরাবন্দী হন তৃপ্তি রায় নামের এক সিনিয়র নার্স। অভিযুক্ত তৃপ্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত আছেন।

রবিবার (১৬ আগস্ট) দুপুরে ওই হাসপাতাল থেকে বিভিন্ন ধরনের ৪৮ পাতা ওষুধ বাড়িতে নেওয়ার পথে এলাকাবাসী তাকে বাধা দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হলে তোলপাড় সৃষ্টি হয় সারাদেশ জুড়ে। সৃষ্ট ঘটনায় ভোলার সিভিল সার্জন মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত বোর্ড গঠন করেন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

স্থানীয়রা জানান, তৃপ্তি রায় দীর্ঘদিন ধরে বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কাজ করছেন। যার কারণে সরকারি ওই প্রতিষ্ঠানটির সকলের সাথে তার সুসম্পর্ক তৈরি হয়। এই সুবাদে তিনি বিভিন্ন সময় হাসপাতাল থেকে অবৈধভাবে ওষুধ বাড়িতে নিয়ে যেতেন। একইভাবে রবিবার হাসপাতালের বহির্বিভাগের ওষুধ সরবরাহ কেন্দ্র থেকে ৪৮ পাতা ওষুধ নিয়ে তিনি বাড়িতে যাচ্ছিলেন। এ সময় পথে দুপুর ১ টায় স্থানীয়রা তাকে ধরে ফেলে। পরে তাকে এত ওষুধ কোথায় ও কেন নিয়ে যাচ্ছেন প্রশ্ন করলে কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত আবার হাসপাতালে চলে যান। স্থানীয়রা পিছু পিছু হাসপাতালের ওই কক্ষে ছুটে যান। এ সময় স্থানীয়রা তার হাতে থাকা বক্স ও ইউনিফর্মের পকেট থেকে বিভিন্ন ধরনের ৪৮ পাতা ওষুধ বের করেন।

সোমবার সকালে সরেজমিন পরিদর্শনে হাসপাতালে ভর্তি একাধিক রোগীর সাথে কথা বলে জানা যায়,সব রকমের ওষুধ বাহির থেকে কিনতে হয়।

কুতুবা ইউনিয়নের ছোট মানিকা গ্রামের ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আসা রোগী আমির হোসেন জানান, রবিবার তারা হাসপাতালে ভর্তি হন। স্যালাইন, জিংকসহ সব ওষুধ তাদেরকে বাইরের থেকে কিনতে হয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও স্টোরকিপার আব্দুল মান্নান জানান, হাসপাতালে ডায়রিয়ার স্যালাইন (৫০০ এমএল ৩০ টি)ও জিংক ওষুধ আছে। তবে বাইরে থেকে কেন কিনতে বলেছেন এর সদুত্তর দিতে পারেনি কর্তব্যরত নার্স মর্জিনা বেগম।

একই রকম অভিযোগ আন্তঃবিভাগে ভর্তি সাদেজা ইয়াসমিনসহ অনেকের। জনমনে প্রশ্ন তাহলে হাসপাতালের বরাদ্দকৃত ওষুধগুলো যাচ্ছে কোথায়? তবে আন্তঃবিভাগে বরাদ্দকৃত ওষুধের রেজিস্ট্রার দেখতে চাইলে দায়িত্বরতরা দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

বিতরণ বিভাগের দায়িত্বরত আবুল কালাম জানান, স্লিপ নিয়ে আসলে আমি ঔষধ দিতে বাধ্য।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত নার্স তৃপ্তি রানী রায় জানান, তিনি ৬-৭ টি স্লিপের মাধ্যমে তার আত্মীয়-স্বজনদের জন্য ওই ওষুধগুলো নিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রয়োজনে মাঝে মাঝেই এভাবে ওষুধ নিয়ে যান বলে স্বীকার করেন তিনি। প্রক্রিয়াটি বৈধ কি না এমন প্রশ্নের জবাবে নীরব থাকেন তিনি।

তবে বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, সৃষ্ট ঘটনায় সিভিল সার্জন ভোলা সদর হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মনিরুজ্জামানকে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। যারা ২০ আগস্ট এর মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিবেন।

আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডাক্তার সাজ্জাদ হোসেন জানান, ৪৮ পাতা সরকারি ওষুধ এভাবে নেওয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তাদের রিপোর্ট অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তপতী চৌধুরী জানান, আইন বহির্ভূতভাবে ওষুধগুলো নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আমার পছন্দ হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিভিল সার্জনের অনুকূলে চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করবেন।’

ভোলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

ইত্তেফাক/এএএম

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: