করোনা সংকটে ৪০-৫০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা ঝরে পড়ার আশঙ্কা

প্রতি বছর আলাদা জেন্ডার বাজেট হলেও এ বছর হয়নি। শুধু তাই নয়, নারী উন্নয়ন সহযোগী একশ কোটি টাকার থোক বরাদ্দও রাখা হয়নি। অথচ করোনা মহামারির কারণে ইতিমধ্যে চাকরি হারিয়েছেন অনেক নারী কর্মী। উইমেন চেম্বারস এন্ড কর্মাস ইন্ডাসট্রির মতে লাগাতার লকডাউনের কারণে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তার ঝরে পড়ার আশঙ্কা আছে। এত কিছুর পরও বাজেটে নারীর বিষয়টি স্পষ্ট করে আসেনি। ব্যবসায়ী নেত্রীবৃন্দ মনে করেন ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে নারী স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে যে অগ্রগতি হয়েছে বা ব্যাহত হবে।

নারী ও পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে গত ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে শুরু হয় জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন উপস্থাপন। বর্তমান সরকার জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে ৪৩টি মন্ত্রণালয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি কৌশল, উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার ও আয়বর্ধক কাজে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত কৌশল, সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে নারীর সুযোগ বৃদ্ধি করার কৌশল পৃথক করে ৩টি গুচ্ছে ভাগে প্রতিবেদন তৈরি করে। কিন্তু এবছর জেন্ডার বাজেট না হওয়ায় অনেক বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। তাই বাস্তবায়ন হোক বা না হোক এই র্চচাটা হওয়া গুরুত্বপূর্ণবলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা। তিনি বলেন,একশকোটি টাকার থোক বরাদ্দ এসময় নারী উদ্যোগক্তাদের উন্নয়নে স্বদব্যবহার করা যেত। তাও এবছর নেই। আর সামাজিক সুরক্ষার ভাতা গ্রহিতার সংখ্যা বেড়েছে তবে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। আবার গ্রামীণ অর্থনীতিকে প্রাধাণ্য দিয়ে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দে নারীর জন্য কিছু নির্দিষ্ট করা হয়নি। আবার এই অর্থও যথেষ্ট নয়। ২০ হাজারকোটি টাকার প্রনোদনায় ৫শতাংশ নারীর। আবার ঋণের ৯ শতাংশ সুদের ৫ শতাংশ সরকার ও ৪ শতাংশ নারীর এসকল বিষয় নারী উদ্যোক্তাদের সহায়ক হবে। তবে ব্যাংকের শর্তগুলো অনেক কঠিন উল্লেখ করে ব্যাংকগুলোকে সহজ শর্তে নারীর পাশে থাকার কথা বলেন অধ্যাপক বিদিশা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শরমিন্দ নিলোর্মী বলেন, কোভিড চলাকালীন সময়ে যখন জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে নারী পুরুষ ভিন্ন মাত্রায় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে তখন তা উত্তরণে এবারের বাজেটে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা উত্থাপন করা হয়নি। গার্মেন্টস নারীশ্রমিক ছাটাই হচ্ছে। অভিবাসী শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে।

কৃষি উদ্যোক্তাদের পণ্য বিপননে সীমাবদ্ধতার জন্য টিকে থাকা কষ্টকর। অনেক নারী পশু পালন করে। দুধ বিক্রি ৫০ শতাংশ কমেগেছে, এই দুধ সংরক্ষনের ব্যবস্থা নেই। তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা করার পাশাপশি নারীদের জন্য কোভিড-কালীন উন্নয়ন কর্মসূচী গ্রহন এবং ন্বাভাবিক উন্নয়ন কর্মসুচী অব্যহত রাখার পরামশর্ দেন তিনি । উইমেন চেম্বার এন্ড কর্মাস ইন্ডাস্ট্রি লি:এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সঙ্গীতা আহমেদ বলেন,লাগাতার ব্যবসা বন্ধ,এখন সিমিত আকারে খুললেও বেঁচা-কিনি নেই। তাই আমাদের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া আবার নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বাজেটে তেমন কিছুই প্রতিফলিত হয়নি। আবার ঋণ বা প্রনোদনার টাকা শর্ত সাপেক্ষে নেয়া পুরুষের জন্যই কঠিন আর নারীর জন্য তা আরও কঠিন। আমাদের অনেক সদস্য বিউটি পার্লারের ব্যবসা করে। যা প্রায় বন্ধই, হুমকির মুখে। বিউটি র্পালারের অনেক উদ্যোক্তা এখন সবজি বিক্রি করে। আমাদের হিসাবে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা ঝড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। ১০০কোটি টাকার থোক বরাদ্দর সুযোগ নিয়ে ৫৪ হাজার নারী উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষন দিয়েছি। তারা কাজ করছিল। করোনার মত বিপর্যয় এলে কিভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা যায় এবার সে বিষয় প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু থোক বরাদ্দই গত বছরথেকে বন্ধ।

সংগঠনের সভাপতি সংসদ সদস্য সেলিমা আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন,দুর্যোগ উত্তরণে নারীদের জন্য সুস্পষ্ট করে কিছু নাই। আর স্পষ্ট করে কিছু না থাকলে আদায় করা কঠিন। তিনি বলেন,এসময় ই-কমার্স নারীদের সহযোগিহতে পারে।কিন্তু অনেক নারী তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষ নয়। প্রশিক্ষন দিয়ে নারীর দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট উইমেন্স চেম্বার এন্ড কর্মার্স ইন্ডাট্রিজ লি: এখানে আপত্তি করে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়। কারণ তারা প্রশিক্ষন দিচ্ছে আর কারো প্রশিক্ষন দেয়ার প্রয়োজন নেই। এটাকোন ভাবেই যুক্তি যুক্ত না। আমরা কেউ কারো প্রতিদ্বন্দ্বি না। সবার মলিত প্রচেষ্টা নারীকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা বানু বলেন, জেন্ডার বাজেট না হওয়ায় আমরা দেখতে পারবো না কোন কোন খাতে নারীর জন্য কি ব্যয় হচ্ছে। এ সময় নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় কিভাবে ভূমিকা রাখে তা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বলেন, করোনা আক্রান্ত নারী,গর্ভবতী-মা এবং সাধারন স্বাস্থ্য সেবা প্রদান কিভাবে সম্পন্ন্ হবে তা বাজেট না থাকায় আমাদের কাছে পরিস্কার না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অবডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিজ (বিআইডিএস) এর সিানয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, করোনা সংকটের এ সময়ে নারীর কর্মসংস্থান হুমকির মুখে এবং নারী উদ্যোক্তারাও সংকটের মুখে আছেন। এ সংখট কাটিয়ে উঠকে কাটিয়ে উঠতে বাজেটে বরাদ্দ জরুরি। তা না হলে করোনার পরেও নারীর ঘুরে দাড়াতে পারবে না।

ইত্তেফাক/এএম

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: