ভরসাহীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তারা

ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তারা ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে ভরসাহীন হয়ে পড়ছেন। সময় যতই যাচ্ছে, ততই অমানিশার অন্ধকার জেঁকে বসেছে তাদের ওপর। কোনো আশাই যেন নেই, ব্যাংকগুলোর দ্বারস্থ হয়ে বরং আশার বাণী নয়—হয়রানির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। অথচ ব্যাংকগুলোকে বলার পরও প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণসহায়তার অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে না।

সরকারঘোষিত ১ লাখ কোটি টাকার প্যাকেজে খাতভিত্তিক বরাদ্দ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সে হিসাবে ক্ষুদ্র, মাঝারি খাতের (এসএমই) জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকৃতই তারা ঋণ পাচ্ছেন না। কোনো কোনো ব্যাংক নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের নামমাত্র ঋণ দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছেন। এক টাকাও বিতরণ করেননি এমন ব্যাংকের সংখ্যাও কম নয়। সরকারি খাতের বেসিক ও বিডিবিএল এবং বেসরকারি খাতের যমুনা ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক এসএমই ঋণ বিতরণে গুরুত্ব দিচ্ছে না। একই তালিকায় আরো রয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংক, এনআরবিসি, ইউনিয়ন ব্যাংক। এছাড়াও যারা বিতরণের খাতায় নাম লিখিয়েছেন তারাও নামমাত্র পরিচালকদের পছন্দের লোকদের ঋণ দিয়েছে।

শুধু এসএমই খাতেই নয়, অন্য খাতেও সরকার বরাদ্দ দিলেও তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে ব্যাংকগুলো। অথচ ব্যাংকগুলোকে বেশ কিছু সুবিধাও দিয়েছে। করোনা ভাইরাসের কারণে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে বিশ্ব জুড়েই ক্রেতা-বিক্রেতাকে নগদ অর্থ যোগান দেওয়া হচ্ছে। তারই আলোকে বাংলাদেশ কিছু উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের ওপর পড়েছে, সেই ব্যাংকগুলো টালবাহানা করছে। ফলে, শিল্প উদ্যোগ টিকে থাকতে পারছে না। ক্ষুদ্র, মাঝারি অনেক উদ্যোক্তা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। এই সময়ে কোথায় যাবেন—নিজের বিনিয়োগ, সংসার, কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি এখন তারা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের বিকল্প কোনো পথ দেখছেন না তারা।

প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় অর্থ ছাড় না করায় দৈনিক ইত্তেফাক ইতিমধ্যে বেশ কিছু রিপোর্টও প্রকাশ করেছিল। তারই আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কঠোর নির্দেশনাও দিয়েছিল। পাশাপাশি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরাও টেলিফোনে তাদের কষ্টের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু ব্যাংক মালিক-ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পাষাণ হূদয় গলছে না। বরঞ্চ কোনো কোনো ব্যাংক চাকরিচ্যুতির নাটক করছে। গোপনে আবার নতুন নিয়োগও দিচ্ছে। মুখ দেখে নিজস্ব লোকদের পদোন্নতিও থেমে নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে, কর্মসংস্থান ধরে রাখতে হলে এই সময়ে নগদ টাকা সরবরাহের বিকল্প পথ নেই। উত্পাদক থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত সবার হাতে টাকা থাকলেই অর্থনীতি চাঙ্গা থাকবে, প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধির পথ সুগম হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। আবার ঋণ আমানত অনুপাত সীমা (এডিআর) ২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। নীতি সুদহার বা রেপো দশমিক ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে।

এছাড়া ১৯টি প্যাকেজের মধ্যে প্রায় সবগুলোতেই পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে টাকা দেবে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রণোদনা প্যাকেজের প্রায় অর্ধেকই আসবে পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে। করোনার অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বড় শিল্প ও সেবা খাতের জন্য চলতি মূলধন বাবদ ৩০ ?হাজার কোটি টাকা ও এসএমই খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণের সুদের অর্ধেক পরিশোধ করবে সরকার, বাকি অর্ধেক গ্রাহক। ব্যাংকগুলোতে যাতে তারল্যসংকট না হয়, সে জন্য বড় অঙ্কের পুনঃ অর্থায়ন তহবিলও গঠন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর আগে ৯ শতাংশ বা সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার বাস্তবায়নের সময় ব্যাংকগুলো সরকারের কাছ থেকে নানা সুবিধা আদায় করে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত বেসরকারি ব্যাংকে রাখার বিধান। তখন সরকারি আমানতের অর্ধেক বেসরকারি ব্যাংকের রাখতে সরকারকে বাধ্য করেন ব্যাংকের মালিকরা। এছাড়া এডিআর বাড়ানোসহ বেসরকারি ব্যাংকের সুবিধা হয় এমন অনেকগুলো বিধান করতে বাধ্য হয়। যদিও যে সময়ে ব্যাংক ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ করার কথা ছিল সে সময়ে করেনি ব্যাংকগুলো। এমনকি এখনো পর্যন্ত ১৩টি ব্যাংকের সুদহার ৯ শতাংশের বেশি।

ইত্তেফাক/এসি

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: