বেশি সুদের চেয়ে কম সুদের প্রতিষ্ঠানগুলোকেই পছন্দ আমানতকারীদের!

ঢাকা, ৬ নভেম্বর- করোনাকালে মানুষের ব্যয় বাড়লেও আয় বাড়ছে না। জমানো সঞ্চয় ভেঙে ফেলতে হচ্ছে অনেককে। তবে এর মধ্যেও ব্যাংকে বা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা জমাচ্ছেন কেউ কেউ। আগে মানুষ আমানত রাখার ক্ষেত্রে কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বেশি সুদ দেয় সেই খোঁজ নিতো। কিন্তু মানুষ এখন সুদের হারের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে, বেশি সুদের চেয়ে কম সুদের প্রতিষ্ঠানগুলোকেই পছন্দের তালিকায় রাখছেন আমানতকারীরা। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমনটিই জানা গেছে।

আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেও একই রকম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে- যেসব ব্যাংকে সুদের হার কম, সেসব ব্যাংকে আমানত বেড়েছে। ব্যাংকের চেয়ে সুদের হার বেশি হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমানত কমে গেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মানুষর আর ঠকতে চায় না। তাই মানুষ এখন অনেক ভেবে-চিন্তে প্রতিষ্ঠান বাছাই করে তারপর আমানত রাখছেন।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বলেন, ‘আমানত রাখার ক্ষেত্রে বেশি সুদের প্রতিষ্ঠান না খুঁজে, বেশি ভালো প্রতিষ্ঠান খোঁজা উচিত। বেশি লাভের আশায় ঝুকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে আমানত রেখে মূল টাকাও ফেরত পাচ্ছেন না অনেকে।

বেশি সুদে কয়েক বছর আগে পদ্মা ব্যাংকে (সাবেক ফারমার্স ব্যাংকে) আমানত রেখে অনেকেই বিপদে পড়েন। পিপলস লিজিংসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীরা এখনও তাদের মূল জমানো টাকাই ফেরত পাচ্ছে না। তাই মানুষ এখন ভালো প্রতিষ্ঠান বাছাই করে আমানত রাখছে। এতে বেশি সুদের চেয়ে তুলনামূলক কম সুদের প্রতিষ্ঠানেই আস্থা রাখছেন আমানতকারীরা।’

সাধারণত ঋণ বিতরণের স্বার্থে সর্বনিম্ন তিন মাস থেকে তিন বছর বা তারও বেশি সময়ের জন্য ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে থাকে।
প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাসের কারণে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে একধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই গত ১ এপ্রিল থেকে আমানতে ৬ শতাংশ সুদহারের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এই সীমা না মেনে যেসব ব্যাংক বেশি সুদে আমানতের অফার দিচ্ছে, সেই ব্যাংকগুলোতে মানুষ যেতে চাইছে না।

তবে যেসব ব্যাংকে সুশাসনের পাশাপাশি অনিয়ম-দুনীতি কম, সেসব ব্যাংকে বেড়েছে আমানত প্রবৃদ্ধি। করোনাকালে আমানত প্রবৃদ্ধির শীর্ষে রয়েছে ট্রাস্ট ব্যাংক, দ্য সিটি ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক। তবে টাকার পরিমাণের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি আমানত বেড়েছে ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের। যদিও দেশের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুদ দিচ্ছে চতুর্থ প্রজন্মের পদ্মা (সাবেক ফারমার্স) ব্যাংক। ব্যাংকটি তিন থেকে ছয় মাসের কম সময়ের আমানতে সুদ দিচ্ছে ৭ শতাংশ হারে, ছয় মাস থেকে এক বছরের কম সময়ের জন্য ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং এক বছর থেকে তার বেশি সময়ের জন্য আমানতের সুদ দিচ্ছে সাড়ে ৭ শতাংশ।

অন্যদিকে নন-ব্যাংকিং তথা আর্থিকপ্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতে সুদের হার ১০ শতাংশের ওপরে। কিন্তু তবুও এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আমানত চলে যাচ্ছে অল্প সুদের ব্যাংকগুলোতে। অবশ্য করোনার কারণে ব্যাংকগুলোর প্রধান হাতিয়ারই দুর্বল হয়ে পড়েছে, ঋণ বিতরণে ব্যাংকের মূল শক্তি দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ী আমানত কমে গেছে। ব্যাংকের মোট আমানতের প্রায় অর্ধেক জোগান আসে এই খাত থেকে।

করোনা মহামারিতে এপ্রিল থেকে জুন তিন মাসে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ী আমানতের পরিমাণ কমেছে ১৩ হাজার ৯৪৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এই তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকের আমানত রাখা গ্রাহক কমেছে পৌনে দুই লাখ। জানা গেছে, গত মার্চ শেষে মেয়াদি আমানতের হিসাবের সংখ্যা ছিল ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৭টি। জুন শেষে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২ লাখ ৯১ হাজার ৪৪৩টি। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে হিসাবের সংখ্যা কমেছে এক লাখ ৭৩ হাজার ১৩৪টি।

জানা গেছে, এপ্রিল-জুন সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত কমেছে ৩৮০ কোটি টাকা। খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। এই কারণে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রাহকরা টাকা তুলে নিয়েছেন। যদিও এপ্রিল-জুন সময়ে ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ বেড়েছে ৫৩ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা।

দেশের বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর জুন-ভিত্তিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে আমানতে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে বড় ও ভালো ভাবমূর্তিতে থাকা ব্যাংকগুলোর। এই সময়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমানতে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ট্রাস্ট ব্যাংকের। তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে ট্রাস্ট ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। যদিও ব্যাংকটি স্থায়ী আমানতের জন্য সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি সুদও দিচ্ছে না। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমানতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে দ্য সিটি ব্যাংকের। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ২ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। আমানত প্রবৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

দ্য সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘গ্রাহকরা ভালো ও ভিত মজবুত এমন ব্যাংকে আমানত রাখতে বেশি নিরাপদ বোধ করছেন। দ্য সিটি ব্যাংক তেমনই একটি ব্যাংক।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ব্যাংকে থাকা বেশি সুদের আমানতও কম সুদের সিটি ব্যাংকে আসছে। এই করোনাকালে সিটি ব্যাংকের আমানতে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সেটি এই ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।’

করোনাকালে আমানত প্রবৃদ্ধিতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে তৃতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির আমানত প্রবৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ২০ শতাংশ।

আমানত প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ হলেও টাকার পরিমাণে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমানত বেড়েছে ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের। চলতি বছরের প্রথমার্ধে বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় এই ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ৫ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আহরণ ও এজেন্ট ব্যাংকিং ইসলামী ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধির বড় কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রসঙ্গত, গত এপ্রিলের আগে বেশি সুদ দিয়েই করপোরেট ও ব্যক্তি শ্রেণির গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতো ছোট ও দুর্বল ব্যাংকগুলো। কিন্তু ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া নয়-ছয় সুদহার বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কম সুদে আমানত সংগ্রহ করতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। এতেই ছোট ব্যাংকগুলো থেকে আমানত বেরিয়ে যাচ্ছে। তথ্য বলছে, গত কয়েক মাস ধরেই চতুর্থ প্রজন্মের প্রায় প্রতিটি ব্যাংকের আমানত কমেছে। এছাড়া দুর্বল ও অনিয়মের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আমানতও কমেছে।

এই প্রসঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ঋণের টাকা ব্যাংক ফেরত না পেলে ওই ব্যাংকে আমানত ফেরত পাওয়া নিয়েও ভয় থাকে। এই কারণে ভালো ব্যাংক দেখে কম সুদেই আমানত রাখছেন অনেকে। আবার কস্ট অব ফান্ড কমানোর স্বার্থেই অনেক ব্যাংক উচ্চসুদের স্থায়ী আমানত ছেড়ে দিচ্ছে। ফলে তাদের আমানত কমে যাচ্ছে।’

জানা গেছে, গত মার্চে দেশের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪৩ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। জুন শেষে আমানত কমে হয়েছে ৪৩ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। গত এপ্রিল-জুন এই তিন মাসে ৩৭৯ কোটি টাকা আমানত কমে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘পিপলস লিজিংসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি–সংকট তৈরি হয়েছে। যে কারণে অনেকেই হয়তো এসব প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা তুলে ভালো প্রতিষ্ঠানে রাখছেন।’

প্রসঙ্গত- ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির মধ্যে একটি এখন বিলুপ্তির পথে, বাকি তিনটিও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গত সেপ্টেম্বরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের তিনটি বিশেষায়িতসহ মোট ৯টি রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক আমানতের বিভিন্ন মেয়াদে সাড়ে ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদ অফার করছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, জনতা, বেসিক, বিডিবিএল-এর সুদহার ৫ দশমিক ৫০ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত। অবশ্য রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ দিচ্ছে আমানতকারীদের। ব্যাংকটি তিন মাস থেকে এক বছরের কম সময়ের সুদ ৪ দশমিক ৫০ থেকে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, তিন বছর বা তার বেশি সময়ের সুদহার ৬ থেকে ৯ শতাংশ।

দীর্ঘমেয়াদি আমানতে সবচেয়ে বেশি সুদ ঢাকা ব্যাংকের। ব্যাংকটি তিন বছর বা তার বেশি সময়ের জন্য আমানতে সুদ দিচ্ছে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। তিন বছরের কম সময়ের এফডিআরে ব্যাংকটির সুদহার সাড়ে ৫ থেকে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ।

তিন মাস থেকে তিন বছর বা তার বেশি সময়েরর জন্য সাউথবাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক (এসএবিসি) সাড়ে ৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে। দুই বছরের বেশি সময়ের আমানতে পূবালী ব্যাংক দিচ্ছে ৮ শতাংশ সুদ। এক বছর পর্যন্ত এফডিআরেই সাড়ে ৭ শতাংশ সুদ দিচ্ছে মেঘনা ব্যাংক।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড আমানতের মুনাফা দিচ্ছে সাড়ে ৭ শতাংশ পর্যন্ত। দীর্ঘমেয়াদি আমানতে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ সুদ দিচ্ছে দ্য সিটি ব্যাংক। এছাড়া বেশিরভাগ বেসরকারি ব্যাংকেরই এফডিআরে সুদহার ৬ শতাংশ।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আর/০৮:১৪/৬ নভেম্বর

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: