হানিফ সংকেত, ইত্যাদি এবং একজন এন্ড্রু কিশোর

কোনো বরেণ্য মানুষের মৃত্যুর পর সাধারণত স্মৃতিকথা প্রকাশ করা হয় গণমাধ্যমে। বন্ধু-সহকর্মীদের স্মৃতিতে পাঠক-দর্শকরা জানতে পারে শিল্পী জীবনের আরো কিছু অংশ। কিন্তু একজন হানিফ সংকেত ও এন্ড্রু কিশোরের সম্পর্কটা ছিল এসব ব্যাকরণেরও বাইরে। নিবিড় এক বন্ধুত্ব ছিল তাদের। সেই সব স্মৃতিপাঠ নিয়ে হয়তো কোনো এক গ্রন্থ লেখা যাবে। দু’জন মানুষের সঙ্গে অদ্ভুত এক মিলও ছিল। তা হলো এই দুই বন্ধুর কারো ভেতরেই বাড়তি প্রচার প্রীতি নেই, ছিল না।

এ যুগে এই সময়ে যা বিরল এবং দু’জনই চূড়ান্ত মাত্রার পেশাদার। কোনো বাহুল্য নেই কথায় বা আচরণে। নিজের কাজ ছাড়া গানের জন্য এখনকার এত এত মিউজিক ভিডিও করে যে সতেজ রাখার চেষ্টায় যখন সিনিয়র-জুনিয়র শিল্পীরা মরিয়া সেখানে এর তোয়াক্কাও করেননি এন্ড্রু কিশোর। অথচ এদেশের আধুনিক গানের সর্বাধিক হিট গানের কণ্ঠশিল্পীর নাম এন্ড্রু কিশোর। ঠিক একইভাবে হানিফ সংকেতও এদেশের গণমাধ্যমে সবচেয়ে কম সময় প্রচারে থেকে শোবিজ ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে দামি তারকা। দু’জনের ভেতরে এক দারুণ বোঝাপড়া ছিল। অসুস্থ অবস্থায় থেকে ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুর হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে যাবতীয় বিষয়ে এন্ড্রু কিশোর প্রথম যার সঙ্গে পরামর্শ করতেন তিনি হানিফ সংকেত। সুখে দুখে সবসময়ের সংযোগ ছিল তাদের।

তাই স্মৃতিচারণার কথা তুললেই হানিফ সংকেত বলেন, ‘এন্ড্রু সর্বশেষ সিঙ্গাপুরে যখন সুস্থ হয়ে গেলেন তখন ডাক্তাররা বললেন যে, সে পুরোপুরি সুস্থ। সেদিনই উচ্ছ্বাস নিয়ে কত কথা বললো। কথায় কথায় ঠিক হলো যে, দেশে ফিরেই ইত্যাদিতে গান গাইবে। আমিও যথারীতি রফিকুজ্জামান ভাইকে জানালাম। তিনি একটি বিষয় দাঁড় করিয়ে লিখলেন। এন্ড্রু বারবার খোঁজ নিচ্ছিলেন। একজন শিল্পীর মনের আকুতি যা থাকে। অথচ হঠাত্ করেই আবার যখন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলো। বিষণ্ন মনে দেশে ফিরেই কল দিলো কিশোর। গানটি অর্ধেক লেখা আছে। এই গানটি আর করা হবে না। না অন্য কাউকে দিয়েও গাওয়াতে চাই না।

বন্ধুর প্রতি এ আমার আমাদের সম্মান। এন্ড্রু কিশোর আর নেই, প্রিয় বন্ধুর মৃত্যু সংবাদটি নিজের হাতে এত তাড়াতাড়ি লিখতে হবে কখনও কল্পনাও করিনি। এই মুহূর্তে কানে বাজছে রাজশাহী থেকে বলা কিশোরের শেষ কথাগুলো— দোয়া করিস বন্ধু, কষ্টটা যেন কম হয়, আর হয়তো কথা বলতে পারবো না। এরপরই খুব দ্রুত শরীর খারাপ হতে থাকে কিশোরের। আর আমারও যোগাযোগ বেড়ে যায় রাজশাহীতে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। অবশেষে সবাইকে কাঁদিয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় এন্ড্রু কিশোর। বাংলা গানের ঐশ্বর্য্য, যার খ্যাতির চাইতে কণ্ঠের দ্যুতিই ছিল বেশি। যার মৃত্যুতে সংগীতাঙ্গনের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল। অনেক কষ্ট পেয়েছি বন্ধু, এত তাড়াতাড়ি চলে যাবি ভাবিনি। কিশোরের আত্মার শান্তি কামনা করছি।’

ইত্তেফাক/বিএএফ

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: