এন্ড্রু দা খালি গলায় গাইছেন, সবাই কাঁদছেন!

সদ্যপ্রয়াত কিংবদন্তী শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গে নানা সম্পর্কের গল্প, হাসি ঠাট্টা, আনন্দের মূল্যবান স্মৃতি রয়েছে অনেকের। এর ভেতরে কেউ বন্ধু, কেউ সহকর্মী আর বিশ্বজোড়া অগণিত ভক্তকূল। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে, সবচেয়ে কঠিনতম দিনগুলোতে যার কাছে শিল্পী এন্ড্রু কিশোর সুখ-দুঃখের কথা শেয়ার করেছেন। চিকিত্সারত অবস্থায় যেকোনো কিছু অকপটে বলেছেন তিনি সিঙ্গাপুর প্রবাসী বাঙালি ব্যবসায়ী মোহা. সাহিদুজ্জামান টরিক। শিল্পীর শেষ জীবনে একান্তে কাটানো স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন তিনি একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব এন্ড্রু কিশোরকে নিয়ে। ইত্তেফাক পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো সেই অমূল্য স্মৃতিগদ্য—

মোহা: সাহিদুজ্জামান টরিক

সিঙ্গাপুরে ব্যবসায়িক সূত্রে বিজনেস চেম্বারের নেতা হিসেবে বাংলাদেশে অনেক শিল্পী-কলাকুশলীর সঙ্গেই পরিচয় বা তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি, এখনো করি। সেই প্রবাস জীবনেই শিল্পী এন্ড্রু কিশোরকে একেবারেই আলাদা করে চেনা হলো আমার। বরেণ্য এই মানুষটির সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। একেবারেই পারিবারিক এক ভ্রমণে এসেছিলেন তখন এন্ড্রু কিশোর, মনির খান ও জাহাঙ্গীর। না, এই তিন কণ্ঠশিল্পী কোনো কনসার্টের জন্য আসেননি সেবার। প্রত্যেকে তাদের সহধর্মিণীকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন ঘুরতে। একান্তে কিছুটা সময় কাটাতে।

কণ্ঠশিল্পী জাহাঙ্গীর আর আমি যেহেতু একই এলাকার, অর্থাত্ চুয়াডাঙার ছেলে, তাই পূর্ব পরিচিত আমরা। জাহাঙ্গীরই আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো বাকিদের। এন্ড্রু কিশোর আমার সঙ্গে হাত মেলাতে মেলাতে বললেন, ‘যাক নিজের এলাকার মানুষ পাওয়া গেল।’ এরপর সিটির বিভিন্ন জায়গায় ঘুরলাম। বাঙালি হোটেলে খেলাম আমরা। কথায় কথায় নানা হিউমার তৈরি করতে এন্ড্রু কিশোর ছিলেন দারুণ পারদর্শী। তাই আড্ডার মধ্যমণি তিনিই। তখনও আমি সিঙ্গাপুরে নিজের ব্যবসা শুরু করিনি। অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। আমার উদ্যোম দেখে এন্ড্রু কিশোর বলেছিলেন, ‘আপনি একদিন এই দেশে অনেককিছু করবেন। আপনার ভেতরে সেই উদ্যোম আর সততাটা বুঝতে পারি।’ জানি না, কী দেখে কেন বলেছিলেন। কিন্তু কথাটা মনে আছে আমার আজও। নিয়তিটা কেমন, কে জানতো! জীবনের শেষদিনগুলো আমার এই প্রিয় শিল্পী আমারই তত্ত্বাবধানে বা আমার খুব কাছে কাটাবেন!

এরপর বিচ্ছিন্নভাবে নানা আলাপ। তিনিও ব্যস্ত, গান নিয়ে সারাবিশ্ব জয় করেছেন। আমিও সিঙ্গাপুরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছি। দীর্ঘ জীবনের যাত্রাপথে আবারো যে তার সঙ্গে দেখা হবে এটা হয়তো জানতাম। কিন্তু এমন সময়ে তাকে এভাবে পাবো ভাবিনি। এভাবে হারাবো প্রত্যাশা করিনি। গতবছর ২০১৯-এর মাঝামাঝি। এন্ড্রু দা আমার হোটেল শাহেদ অ্যাপার্টমেন্টে উঠলেন। সেখান থেকেই চিকিত্সা নেবেন। ডাক্তার তার শরীরে ক্যান্সার পেলেন। ভাবির সঙ্গে আমার রেগুলার কথা দেখা-সাক্ষাত্ হচ্ছে। ডাক্তারের অ্যাপয়েনমেন্ট থেকে শুরু করে যতটুকু সহযোগিতা করার আমরা করছি। এন্ড্রু দাকে বললাম, ‘আপনার যা প্রয়োজন প্লিজ নির্দ্বিধায় আমাকে বলবেন। চিকিত্সা চলছে। এর ভেতরে তার চিকিত্সা ব্যয় ও খরচ সংকুলানের জন্য কনসার্টের উদ্যোগ নিই আমরা। এন্ড্রু দা প্রথমে রাজি হননি। পরে তাকে রাজি করানো হলো।

তার আগে আমেরিকার কয়েকজন প্রমোটারও চ্যারিটির উদ্যোগের কথা বললেন। তাদের সঙ্গে কীভাবে ডিল হবে? টাকা-পয়সার যাবতীয় বিষয়ে এন্ড্রু দা আয়োজকদের বললেন, ‘তোমরা শাহেদ যেভাবে বলে, সেভাবে কাজ করো। ও সব দেখাশোনা করবে।’

আমরা সিঙ্গাপুরে একটি প্রেসমিটের আয়োজন করলাম। সেখানে সিঙ্গাপুরের প্রবাসী গুণী মানুষ, ব্যবসায়ী, কুটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। খুব অল্প কথায় এন্ড্রু দা বক্তব্য দিলেন। তার কথা শুনে মুগ্ধ আর অবাক হলাম সেদিনও। তিনি বললেন, ‘আমি বাংলাদেশের একজন শিল্পী। আমার নাম এন্ড্রু কিশোর। এন্ড্রু কিশোর চিকিত্সার সাহায্যার্থে টাকা চাইছেন এটা আমি হতে দেবো না। দুঃস্থ শিল্পী আমাকে যেন বলা না হয় কখনো। হ্যাঁ, কেউ যদি আমার গান ভালোবেসে কিছু উপহার দিতে চায় সেটা ভিন্ন। তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু চ্যারিটি বা সাহায্যের আবেদনে আমি কারো কাছে হাত পাতিনি, পাতবো না।’

দাদার কথায় মুখরিত হলো পুরো হলরুম। সিঙ্গাপুরে সেই অনুষ্ঠানের কথা আমরা সবাই জানি। সৈয়দ আব্দুল হাদী এসেছিলেন। ভারত থেকে মিতালী মুখার্জিও এসেছিলেন। এক ঐতিহাসিক কনসার্টের আয়োজন করতে পেরেছিলাম সেদিন। সাধারণ মানুষ এন্ড্রু কিশোরকে কতটা ভালোবাসেন তা সেদিন নিজ চোখে দেখেছিলাম। এন্ড্রু দা খালি গলায় গাইলেন জীবনের গল্প। গানটি গাইতে গাইতে একটা পর্যায়ে দাদার কথায় কান্না ধরে আসছিল। সেই মুহূর্তে পুরো অডিটোরিয়ামের মানুষ চোখের জল ফেলেছে। একজন শিল্পীর প্রতি কী যে মায়া, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা সেদিন আমি দেখেছি। আমাদের টার্গেটেরও বেশি অর্থ উঠেছিল। অবাক করার মতো বিষয় হলো এন্ড্রু দা অনুষ্ঠানেই ঘোষণা দিলেন ৫ হাজার ডলার যেন তার সহকর্মী অসুস্থ সুরকার সেলিম আশরাফকে দিয়ে দেওয়া হয়। এন্ড্রু দা-ও কিন্তু তখন ভীষণ অসুস্থ। আমরা একজন শিল্পীর দৃপ্ততা, ব্যক্তিত্ব আর মহানুভবতা কাছ থেকে দেখেছিলাম।

আগামীকাল পড়ুন:এন্ড্রু কিশোর ক্যান্সার হাসপাতাল দিতে চেয়েছিলেন

লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শাহিদ গ্রুপ, সাবেক সভাপতি সিঙ্গাপুর-বাংলাদেশ সোসাইটি ও বিজনেস চেম্বার অব সিঙ্গাপুর

ইত্তেফাক/এসআই

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: