ফ্যাশনে আজকের নারী

this is caption

একবিংশ শতাব্দিতে এসে বদলে গেছে ফ্যাশন ধারা। আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে নাম কুড়িয়েছে দেশের বাইরেও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাঙালির ফ্যাশন মর্যাদা পেয়েছে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ট্রেন্ড হিসেবে। আর আমাদের ফ্যাশন শিল্পকে এগিয়ে নিতে যারা নিরলস পরিশ্রম করেছেন তাদের মধ্যে কয়েকজন নারী ডিজাইনারের ভূমিকা অন্যতম।

এছাড়া প্রতিটি পরিবারের ফ্যাশন ডিজাইনার কিন্তু একজন মেয়ে। মা-মেয়েরা তাদের নিজেদের পোশাক ডিজাইনের পাশাপাশি টেবিল ম্যাট, ওয়াল ম্যাট, কুশন ইত্যাদিতে করেন নান্দনিক সূচিশিল্পের কাজ। এভাবেই ফ্যাশনে নারীর অবদান ঘটিয়েছে বিপ্লব। নারী দিবসকে সামনে রেখে আমাদের আয়োজন ফ্যাশনে আজকের নারী।

বিবি রাসেল :

আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল বাংলাদেশের ফ্যাশন জগতে এক রোল মডেল। তিনি ১৯৭৫ সালে লন্ডন কলেজ অব ফ্যাশন থেকে ফ্যাশন বিষয়ে গ্রাজুয়েশন করেন। লন্ডনে পাঁচ বছর ফ্যাশন মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন ম্যাগাজিনে কাজ করেন। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ফ্যাশন মডেল হিসেবে ফ্যাশন শোগুলোতেও অংশ নেন। এরপর ফিরে আসেন বাংলাদেশে। যাত্রা শুরু করেন বিবি প্রোডাক্টস নামে একটি ফ্যাশন হাউসের। বাঙালি সংস্কৃতির উপকরণ ব্যবহারে বাংলাদেশের ফ্যাশনে যোগ করেন দেশিয় সংস্কৃতি। ১৯৯৬ সালে ইউনেস্কোর সহায়তায় ইউরোপের প্যারিসে প্রথম ফ্যাশন শোর আয়োজন করেন। এই শোর মাধ্যমে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় দেশিয় উপকরণের তৈরি বাংলাদেশের পোশাক, ব্যাগ, অলংকার, গামছাকে। আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য এভাবেই প্রথম প্রচার হয় বাংলাদেশের কাপড় এবং হস্তশিল্পের।

‘উন্নয়ন ও ইতিবাচক বাংলাদেশের জন্য ফ্যাশন’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল দেশিয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি কাপড় এবং হস্তশিল্প পণ্যের প্রচার করছেন।

বিবি প্রোডাক্টসের স্বত্বাধিকারী ও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল বলেন, “এক টুকরা কাপড় ছাড়া পৃথিবীর কোনো মানুষ বাইরে বেরুতে পারে না। মানুষের লজ্জা নিবারণের জন্য দরকার হয় কাপড়ের। এই কাপড় দিয়ে তৈরি হয় পোশাক। গ্রাম পর্যায়ে হাজার হাজার নারী শুধু কাপড় বুনেই তাদের উন্নয়ন করেননি, তাদের পরিবারেরও উন্নয়ন করেছেন। উপার্জন করেন দেখেই নারী চিন্তা করেন তার সন্তানের পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষার উন্নতির কথা। গ্রামীণ নারীর হাতে বোনা এই কাপড় আমি বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেছি, এখনও করছি। কারণ একজন শিল্পী সাধারণ বুননের কাপড়কেও তার ডিজাইনের মাধ্যমে অসাধারণ করে তোলেন। গামছাকে আমি পোশাক, ব্যাগে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেছি। গামছার নকশা এবং বুননে বৈচিত্র্য এনে তা আধুনিকতার রূপ দিয়েছি।”

মনিরা ইমদাদ :

তাঁতী সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ সমান তালে কাজ করেন। নারীরা সুতায় নলি ভরা, চরকা কাটা, সুতায় মাড় দেয়া, শুকানোর কাজগুলো করেন। এ কাজগুলো পুরুষ তাঁতীরা কখনো করেন না। তারা শুধু তাঁতে কাপড় বোনেন। অনেক নারী এসব কাজের পাশাপাশি কাপড়ও বোনেন। এতো পরিশ্রমের পর ছিল না তাদের কাজের স্বীকৃতি। পোশাক শিল্পে তাদের অর্থনৈতিক অবদান সম্পর্কেও ছিল অজ্ঞাত। এসব নারী তাঁতীরা কাজের স্বীকৃতি পাবেন এই ভাবনা থেকেই টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের স্বত্বাধিকারী মনিরা ইমদাদ ১৯৮২ সালে এই ফ্যাশন হাউসের যাত্রা শুরু করেন।

তার মতে, “পোশাক দেশিয় সংস্কৃতিকে ধারণ করে। টাঙ্গাইলের শাড়ির নকশা, বুননে দেশিয় সংস্কৃতিকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়েছে। শাড়ির সঙ্গে জড়িত রয়েছে আমাদের দেশিয় আচার, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি। একজন শাড়ি পরিহিত নারীকে দেখা মানেই দেশিয় আচার, কৃষ্টি, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া। নতুন প্রজন্মের মেয়েদের মধ্যে শাড়ি পরার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে মেয়েরা শাড়িকেই প্রাধান্য দেয়। টাঙ্গাইলের শাড়ি দিয়ে শুরু করলেও এখন পাবনা, মিরপুর, রাজশাহী, আদিবাসীদের তাঁত নিয়েও কাজ করেন। শাড়ির পাশাপাশি সেলাইবিহীন থ্রি-পিসও করছেন।”

মনিরা ইমদাদ আরো বলেন, “একজন নারীকে প্রবল ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। ব্যক্তিত্বহীন নারীকে পদে পদে বাধা পেতে হয়। এর ফলে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না।”

লিপি খন্দকার :

যেসব নারী লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত কিন্তু সূচিকর্মে নিপুণ, সূচিকর্মের মাধ্যমে সেসব নারীও সাবলম্বী হয়ে নিজেদের উন্নয়ন করতে পারেন। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি। সেই ভাবনা থেকেই তাদের উন্নয়নে বিবিয়ানার স্বত্বাধিকারী ও ফ্যাশন ডিজাইনার লিপি খন্দকার ২০০১ সালে কাজ শুরু করেন।

লিপি খন্দকার বলেন, “সূচিশিল্পের কাজের জন্য প্রচুর নারী কারিগর প্রয়োজন হয়। আমার প্রতিষ্ঠানে ১৫ হাজার কারিগরের মধ্যে ১৩ হাজার নারী কারিগর সূচিশিল্পের কাজ করেন। এতে নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে এবং তারা সাবলম্বী হয়েছেন। ফ্যাশন হাউসে শতকরা ৮০ ভাগ নারী কর্মী কাজ করেন। ফ্যাশন শুধু পোশাক নয়। ঘরে বসেই আমাদের নারীরা ঘরের বাইরে ব্যবহৃত পাপস থেকে পর্দা, কার্পেট তৈরি করতেন। সুতরাং এটাও ফ্যাশনের অংশ। আমাদের দেশের সব দাদি, নানী, মা-ই ফ্যাশন ডিজাইনার। তারা কুষি কাটায় লেস, ফ্রক, গেঞ্জি, ব্লাউজের হাতায় নকশা করতেন। সোয়েটার বুনতেন। তাদের কাছ থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছেন ফ্যাশন ডিজাইনাররা।”

তাহসীনা শাহীন :

ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে কাজ করবে। ফ্যাশন ডিজাইনকে জীবিকা হিসেবে নেবেন এই ভাবনা থেকেই ফ্যাশন ডিজাইনার তাহসীনা শাহীন ২০০২ সালে সাদাকালোর যাত্রা শুরু করেন।

তাহসীনা শাহীন জানান, আমাদের দেশে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে মেয়েদের যুক্ততা একটু বেশি। কারণ এটি ঘর থেকে শুরু করা যায়। ঘরে বসেই মেয়েরা কাপড় বোনেন, পোশাক তৈরি করতে পারেন। এর মাধ্যমে নারীর জীবন ও জীবিকার এক মেলবন্ধন তৈরি হয়। মেয়েরা ফ্যাশন সচেতন। এ ছাড়া ফ্যাশনের সঙ্গে মেয়েদের সৌন্দর্যের ব্যাপারটাও জড়িত। যে কোনো পোশাকই তাকে মানিয়ে যায়।

এছাড়াও নারী ফ্যাশন ডিজাইনারদের মধ্যে আড়ংয়ের পরিচালক এবং ফ্যাশন ডিজাইনার তামারা আবেদ, ক্রে ক্র্যাফটের নির্বাহী প্রধান এবং ফ্যাশন ডিজাইনার শাহনাজ খান, ফ্যাশন ডিজাইনার মাহিন খান, স্মার্টটেক্সের ফ্যাশন ডিজাইনার তানিয়া কাউসারী দিশা, তুহুস কালেকশনের ফ্যাশন ডিজাইনার তৌহিদা তুহু, নীল সাদা লাল হলুদের ফ্যাশন ডিজাইনার শাহনাজ কাকলী স্ব স্ব ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছেন।

যাকা/এএ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: