পণ্য পরিবহনে ওজন নীতিমালা উপেক্ষিত

পণ্য পরিবহনে সরকারের ‘এক্সেল লোড নীতিমালা’ থাকলেও তা কেউ মানছেন না। ফলে বহনক্ষমতার অতিরিক্ত পণ্য নিয়ে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান চলাচলের কারণে ক্ষতি হচ্ছে সড়ক-মহাসড়ক ও সেতুর।

জানা গেছে, অতিলোভের কারণে পণ্যবাহী যানের চালক ও শ্রমিকেরা ওজনসীমার অতিরিক্ত মালামাল পরিবহন করছেন। সর্বশেষ গত শনিবার অতিরিক্ত সিমেন্ট বোঝাই করে পারাপারের সময় ট্রাকসহ বগুড়ার সারিয়াকান্দির বেইলি ব্রিজ ভেঙে পড়ে। এভাবে বাড়তি ওজন নিয়ে যান চলাচলের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ রয়েছে, যাদের তদারকির দায়িত্ব তারাও এ বিষয়টি তদারক করেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সর্বোচ্চ ব্যয়ে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণের পরও আয়ুষ্কালের অর্ধেক সময়ও টিকছে না মালবাহী গাড়ির মাত্রাতিরিক্ত মালামাল পরিবহনের কারণে। বাড়তি ওজনের এসব গাড়ি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের মহাসড়কগুলোতে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রক সেল বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগের ফলে পণ্য পরিবহনে ভাড়া বাড়বে উল্লেখ করে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের মালিকেরা বলছেন, শুধু ওজন নিয়ন্ত্রক যন্ত্র বসালেই হবে না, যন্ত্রের কাছে বাড়তি ওজনের পণ্য রাখার মতো গুদামঘরের ব্যবস্থাও করতে হবে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, দেশের অনেক স্থানেই মানহীন সড়ক নির্মাণ করা হয়। তার ওপর প্রায়ই দেখা যায় পাঁচ টনের ট্রাকে বহন করা হচ্ছে ১০-১২ টন মাল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সড়ক, মহাসড়ক ও ব্রিজ। সড়কের কয়েকটি স্থানে ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে যন্ত্র বসানো হলেও তা ঠিকভাবে এখনো কার্যকর হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি ওজনের পণ্যবাহী যান থেকে টাকা নিয়ে তা চলতে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

আরও পড়ুন: আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে দলগুলোর সাড়া নেই

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির একজন কর্মকর্তা বলেছেন, গাড়ির লোডিং সিস্টেম যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তাহলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে রাস্তা নির্মাণ করে কোনো লাভ হবে না। ওভারলোড গাড়ি চললে সড়কের ক্ষতি তো হবেই। তিনি আরো বলেন, স্কেল ব্যবহার করার মাধ্যমে লোডিং নিয়ন্ত্রণ করা গেলে তিনটি লাভ হবে। প্রথমটি হলো সড়কের ক্ষতি কম হবে। দ্বিতীয়ত গাড়ির ক্ষতি কমে আসবে। তৃতীয়ত সড়ক দুর্ঘটনা কমবে।

এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বর্তমানে এক্সেল লোড-সংক্রান্ত নীতিমালা কার্যকর রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ওজনসীমা নিয়ন্ত্রণ স্কেল বসানো হয়েছে। মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আরো ওজনসীমা নিয়ন্ত্রণ স্কেল স্থাপন প্রক্রিয়াধীন আছে। পাশাপাশি তিনি সেতুগুলোতে ওভারলোড যানবাহন না চালানোর জন্য মোটরযানের মালিক-শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছেন।

ওজন নীতিমালায় যা রয়েছে :প্রাপ্ততথ্যে জানা যায়, ২০১২ সালের ১১ জুন মোটরযানের এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র পরিচালনা সংক্রান্ত একটি নীতিমালা অনুমোদন করা হয়, যা ২০১২ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর রয়েছে। নীতিমালায় মহাসড়কে চালাচলকৃত ছয় চাকাবিশিষ্ট মোটরযানের সর্বোচ্চ ওজনসীমা (যানবাহন ও মালামালসহ) সাময়িক সময়ের জন্য ২২ টন, ১০ চাকাবিশিষ্ট মোটরযানের সর্বোচ্চ ওজনসীমা (যানবাহন ও মালামালসহ) সাময়িক সময়ের জন্য ৩০ টন এবং ১৪ চাকাবিশিষ্ট মোটরযানের সর্বোচ্চ ওজনসীমা (যানবাহন ও মালামালসহ) সাময়িক সময়ের জন্য ৪০ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নীতিমালা না মানলে দুই থেকে ১২ হাজার জরিমানা গুনতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এ নীতিমালা মোটেও মানা হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান বলেন, উত্সমূলে মালামাল পরিবহনের ওজনসীমা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পুলিশ প্রশাসন, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং পরিবহন এজেন্ট পর্যায়ে কার্যকর মনিটরিং প্রয়োজন।

সড়কে ওভার লোড ঠেকাতে গঠিত কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রোস্তম আলী বলেন, অতিরিক্ত মালামাল বহনের বিষয়টি যারা তদারিক করবে, তারা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন না। এযাবত্ যেসব বেইলি ব্রিজ ভেঙে পড়েছে তার সিংহভাগই ঘটেছে অতিরিক্ত ওজনের কারণে। তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং ওভার লোড বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

দুর্ঘটনা বাড়ছে :অতিরিক্ত ওজন নিয়ে যান চলাচলের কারণে প্রায়ই দেশের বিভিন্ন জেলায় দুর্ঘটনা ঘটছে। গত ১৮ জুলাই অতিরিক্ত সিমেন্ট বোঝাই করে পারাপারের সময় ট্রাকসহ বগুড়ার সারিয়াকান্দির বেইলি ব্রিজ ভেঙে পড়ে। ১০ চাকার একটি ট্রাক ৫০ টন সিমেন্ট (অতিরিক্ত ২০ টন) নিয়ে সারিয়াকান্দি যাওয়ার সময় ব্রিজটি ভেঙে পড়ে। এর আগে ২০১৭ সালে অতিরিক্ত পাথরবোঝাই দুটি ট্রাক পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার মাদার্সী সেতুতে একই সঙ্গে উঠলে সেতুটি ভেঙে পড়ে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বরিশাল-বানারীপাড়া সড়কে বালুবোঝাই একটি ট্রাক বেইলি সেতু পার হতে গিয়ে সেতু ভেঙে খালে পড়ে যায়

২১ মহাসড়কে বসছে নতুন স্কেল :সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী কাজী শাহরিয়ার হোসেন বলেন, দেশের ২১টি মহাসড়কে নতুন করে ওজনসীমা নিয়ন্ত্রণ স্কেল বসানোর কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এগুলো বসানো হলে সুফল মিলবে। সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় গাজীপুর সদর, কেরানীগঞ্জ, হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ী, বুড়িচং, ফেনী সদর, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম সদর, সীতাকুণ্ড, মাধবপুর, বিয়ানীবাজার, রামপাল, সাতক্ষীরা সদর, দামুড়হুদা, শিবগঞ্জ, হাকিমপুর, রৌমারী, তেঁতুলিয়া, সৈয়দপুর, শিবচর ও কালিহাতী উপজেলায় নতুন ওজন স্কেল বসানো হবে।

ইত্তেফাক/এএএম

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: