ঢিলেঢালা জীবনযাপনে বাড়ছে সংক্রমণ

আট মাসের বেশি সময় কোভিড-১৯ ভাইরাস মহামারিতে বিশ্ব টালমাটাল। বাংলাদেশের মানুষ ছয় মাসের বেশি সময় ধরে করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করে চলছে। শুরুতে অদৃশ্য এ সংক্রমণ ঠেকাতে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে লকডাউন, সাধারণ ছুটি, জনচলাচলে সীমাবদ্ধতা তৈরি ইত্যাদি বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।

কিন্তু জীবিকার তাগিদে ও করোনার কারণে সৃষ্ট সার্বিক অর্থনৈতিক অচলাবস্থাকে গতিশীল করতে সরকার ধাপে ধাপে জনজীবনকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই সবকিছু করতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে উদাসীন। স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে ন্যূনতম মাস্কও ব্যবহার করতে চাচ্ছেন না অনেকে। সামাজিক দূরত্ব মানারও বালাই নেই। সার্বিক জীবনযাত্রার চিত্র দেখলে করোনার মতো প্রাণঘাতী ভাইরাসের উপস্থিতি দেশে আছে বলে মনেই হয় না। মানুষের মধ্যে কোনো ধরনের ভয়ভীতি নেই। এভাবে ঢিলেঢালা জীবনযাপনে বাড়ছে সংক্রমণ। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকা।

স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য যেসব কর্তৃপক্ষ আছে তারাও সঠিকভাবে মনিটরিং করছে না। নিজেরা সংক্রমিত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও মাঠে কাজ করছে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, করোনাকে অবহেলা করার সময় এখনো আসেনি। এখনো বিপজ্জনক অবস্থায় আছি। সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এখনই নিশ্চিত করা গেলে বিপদ থেকে আমরা রক্ষা পাব। এক্ষেত্রে ঢিলেঢালা ভাব দেখানোর কারণে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ।

দুই বছরের মধ্যে করোনা ভাইরাস মহামারির অবসান হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস। শুক্রবার জেনেভায় এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ১৯১৮ সালে দেখা দেওয়া স্প্যানিশ ফ্লুকে পরাস্ত করতে দুই বছর লেগেছিল। প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে এখন তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যেই বিশ্ব করোনা ভাইরাসকে হটাতে সক্ষম হবে বলেও ধারণা তার। তিনি বলেন, অবশ্যই, ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আমাদের কাছে সেটিকে থামানোর প্রযুক্তি ও জ্ঞান আছে। বিশ্বের যেসব দেশে করোনা ভাইরাস কমে গিয়েছিল সেসব দেশে এখন আবার বাড়ছে। চীনে করোনা ভাইরাসমুক্ত হয়েছে বলে ঘোষণা করা হলেও পরবর্তী সময় দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে আবার দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্কুল খুলে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে অভিভাবকরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, করোনায় শিশুরা আক্রান্ত হলেও তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু আক্রান্ত শিশুরা অন্যদের সংক্রমিত করে। এটাই বিপজ্জনক।

স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে রাজধানীতে বেড়েছে জনসমাগম। ঢাকার সড়কে সেই চিরচেনা যানজট। ফুটপাত থেকে অভিজাত শপিংমল, পাঁচতারকা হোটেল, বিনোদন ও পর্যটনকেন্দ্রে এখন মানুষের সরব উপস্থিতি। কোথাও সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না। গণপরিবহন স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিচালিত হচ্ছে না। রাজধানীর অনেক ফুটপাতে ভাসমান চা-সিগারেটের দোকান বসেছে। এসব দোকানে উপচে পড়া ভিড়। বিনোদন ও পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে, সেখানেও স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। পুরোনো চেহারায় ফিরেছে কাওরান বাজার। কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে মাছের বাজারে পা ফেলাই দায়। অধিকাংশ দোকানির মুখে মাস্ক নেই। মাস্ক নেই ক্রেতাদের মুখেও। সামাজিক দূরত্ব বলে কিছু নেই।

দেশে করোনা ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণের পর ৫৮তম দিনে এসে ১০ হাজার ছাড়ায়। ১০৩তম দিনে ১৮ জুন এসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ২ হাজার ২৯২। মারা যায় ১ হাজার ৩৩৪ জন। মাত্র ১২ দিনের মাথায় ১১৭তম দিনে ২ জুলাই এসে আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়ায়। মোট আক্রান্তের সংখ্যা হয় ১ লাখ ৫৩ হাজার ২৭৭। একই সঙ্গে মোট মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৯২৬ জনে পৌঁছায়।অর্থাৎ, ১২ দিনে ৫০ হাজার ৯৮৫ জন আক্রান্ত এবং ৫৯২ জন মারা যায়। গত ৩ জুন থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত ২৮ দিনে করোনায় ১ লাখ ৮৩২ জন আক্রান্ত এবং ১ হাজার ২২৬ জনের মৃত্যু হয়। পরবর্তী ১৬ দিনে আরো ৪৮ হাজার ৭৮৯ জন আক্রান্ত এবং ৬৫৫ জন মারা যায়। অর্থাৎ, ৩০ দিনে ৯৯ হাজার ৭৭৪ জন আক্রান্ত এবং ১ হাজার ২৮১ জন মারা গেছে। এই সময়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ২ হাজার ৬৬ জন এবং মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ৫৮১ জনে পৌঁছায়। সংক্রমণের ১৩৩তম দিনে ১৮ জুলাই আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ঐ দিন মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ২ হাজার ৬৬ জনে পৌঁছায়। একই সঙ্গে মোট মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ৫৮১ জন ছাড়ায়। সংক্রমণ দেড় থেকে ২ লাখ ছাড়াতে সময় লাগে ১৬ দিন। সংক্রমণের ১৫৩ দিনে ৭ আগস্ট মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৫২ হাজার ৫০২ এবং মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ৩৩৩ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ, সংক্রমণ ২ থেকে আড়াই লাখ ছাড়াতে সময় লাগে ২০ দিন। এই সময়ে ৫০ হাজার ৪৩৬ জন আক্রান্ত হয়। একই সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে ৭৫২ জন।

গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত শনাক্ত ২ হাজার ২৬৫ জনকে নিয়ে দেশে করোনা ভাইরাসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৯২ হাজার ৬২৫ হলো। আর গত এক দিনে মারা যাওয়া ৪৬ জনকে নিয়ে দেশে করোনা ভাইরাসে মোট মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ৯০৭ জনে দাঁড়াল। ওয়ার্ল্ডোমিটারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী শনিবার পর্যন্ত পাকিস্তানে করোনা শনাক্ত হয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ১৭৪ জনের। ফলে করোনা শনাক্তের বিবেচনায় বাংলাদেশ পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে। তাতে বিশ্ব পরিসংখ্যানেও বাংলাদেশের অবস্থান পরিবর্তন হয়ে ১৬ থেকে ১৫তে উন্নীত হয়েছে। আর পাকিস্তান ১৫ থেকে ১৬ নম্বরে নেমেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে ঢিলেঢালা ভাব দেখানো ঠিক হবে না। যেসব দেশ ঢিলেঢালা ভাব দেখিয়েছে, তাদের খেসারত দিতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই বিপজ্জনক ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।

আরও পড়ুন: বিশ্বে করোনায় মৃত্যু ৮ লাখ ছাড়াল

করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, স্পেনে করোনা ভাইরাস কমে গিয়েছিল, এখন আবার বাড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়াও একই অবস্থা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নতুন করে সংক্রমিত হচ্ছে। আমাদের দেশে কমছে আবার বাড়ছে। এতে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। তাই স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে ঢিলেঢালা ভাব বিপজ্জনক পরিস্থিতি ডেকে আনবে। যতদিন পর্যন্ত সংক্রমণের সংখ্যা ১ হাজারের নিচে নেমে না আসবে, ততক্ষণ ভালো অবস্থা বলা যাবে না। অর্থাত্, আমরা এখনো একই অবস্থায় আছি। তিনি বলেন, করোনা নিয়ে এখন মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি নেই। তাই স্বাস্থ্যবিধি মানতে যা যা করার তা-ই করতে হবে। কারণ এখনো বিপজ্জনক মাত্রায় আছি।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব ও করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য ডা. এম এ আজিজ বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানলে সফলতা আসবে। না মানলে অন্যান্য দেশের মতো খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যায়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ২০-এর নিচে না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা একই অবস্থায় আছি। যে কোনো সময় বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্বে এমন নজির আছে।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, করোনা ভাইরাস কোথাও বাড়ছে, কোথাও কমছে। আমরা বিপজ্জনক অবস্থায় আছি। যে কোনো সময় ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টির হতে পারে। তাই সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৭ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ১০০ রোগী বেড়েছে।

মুগদা জেনারেল হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিত্সায় কর্মরত তিন জন চিকিৎসক বলেন, এখন যে অবস্থা—কখনো বাড়ে, কখনো কমে। এটাকে কমা বলা যাবে না। এখনো আমরা একই অবস্থায় আছি।

ইত্তেফাক/এএএম

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: