সকালে দুবাই পালাতে চেয়েছিলেন গোল্ডেন মনির!

image-366853-1605950592ঢাকা, ২১ নভেম্বর- বেশ কিছুদিন ধরে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা স্বর্ণ ও গাড়ি ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম ওরফে গোল্ডেন মনিরকে কড়া নজরদারিতে রেখেছিলেন। তারা তার অবৈধ সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করার সময় তিনি বিষয়টি আঁচ করতে পারেন। ভয়ে ছিলেন যে কোনও সময় তাকে গ্রেফতার করা হবে। গ্রেফতার এড়াতে আজ শনিবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১১টায় দুবাইয়ের উদ্দেশে পাড়ি জমাতে চেয়েছিলেন সেলসম্যান থেকে হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়া গোল্ডেন মনির। পালিয়ে যাওয়ার খবর জানতে পেরে রাতেই তার বাসায় অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে র‌্যাব। র‌্যাবের লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘একটি গোয়েন্দা সংস্থা মনির সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য সংগ্রহ করে। দীর্ঘ দিনের অনুসন্ধানের শেষ দিকে মনির তা বুঝতে পারে। তাই গা ঢাকা দিতে সে আজ সকালেই দুবাইয়ের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করতে চায়। শনিবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১১টায় ইকে ৫৮৫ ঢাকা-দুবাই ফ্ল্যাটে সে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভিসা নিশ্চিত করে এই ফ্লাইটে টিকিট কাটে মনির। তবে দুবাই নামার পর সে অন্য কোন দেশে যেতে চেয়েছিল কিনা সেটা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযানে তার কাছে ১০ দেশের বিদেশি মুদ্রা জব্দ করা হয়েছে। তার মধ্যে ২০ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল, ৫০১ ইউএস ডলার, ৫০০ চাইনিজ ইয়েন, ৫২০ রুপি, এক হাজার সিঙ্গাপুরের ডলার, দুই লাখ ৮০ হাজার জাপানি ইয়েন, ৯২ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত, হংকংয়ের ১০ ডলার, ১০ ইউএই দিরহাম, ৬৬০ থাই বাথ ছিল।’

উল্লেখ্য, শুক্রবার (২০ নভেম্বর) রাত ১০টার থেকে শনিবার (২১ নভেম্বর) সকাল পর্যন্ত এ অভিযান চালিয়েছেন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গোল্ডেন মনিরের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় ছয়তলা ভবনের বাসায় প্রতিটি ফ্লোরে তল্লাশি করা হয়। অভিযানে অবৈধ অস্ত্র ও মাদকসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

র‌্যাব সূত্র বলছে, তার বিদেশ পালানোর চেষ্টার বিষয়টি আগেই জানা ছিল তাদের। তারপর গতকাল রাতে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও বিদেশি মুদ্রা রাখার অভিযোগে তার নিজ বাসায় রাতভর অভিযান চালিয়ে মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরকে গ্রেফতার করা হয়।

র‌্যাবের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মনির জানান, নব্বইয়ের দশকে গাউছিয়া মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানের সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন মনির। এরপর রাজধানীর মৌচাকের একটি ক্রোকারিজ দোকানে তিনি কাজ নেন। সে সময় এক লাগেজ ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় হলে মনির লাগেজ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। ঢাকা-সিঙ্গাপুর-ভারত, এই রুটে তিনি প্রথমে লাগেজে করে কাপড়, কসমেটিক, ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটার সামগ্রী, মোবাইল, ঘড়িসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আনা-নেওয়া করতেন। এই কাজগুলো করতে করতে তিনি লাগেজে স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন। বায়তুল মোকাররমে একটি জুয়েলারি দোকান দেন, যা তার এই চোরাকারবারি কাজে সাহায্য করে। সময়ের ব্যবধানে মনির বড় ধরনের স্বর্ণ চোরাচালানকারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার নাম হয়ে যায় গোল্ডেন মনির। চোরাচালানের দায়ে ২০০৭ সাল বিশেষ ক্ষমতা আইনে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়।

ভূমি জালিয়াতি সম্পর্কে র‌্যাব জানায়, ২০০১ সালে তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী, গণপূর্ত ও রাজউকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপন করে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভূমি জালিয়াতি শুরু করেন। রাজধানীর বাড্ডা এলাকার রাজউকের ডিআইটি প্রজেক্টে প্রতারণার মাধ্যমে অনেক প্লট নিজস্ব করে নেন। এভাবে রাজউক থেকে প্লট সংক্রান্ত সরকারি নথিপত্র চুরি করে এবং অবৈধভাবে রাজউকের বিভিন্ন কর্মকর্তার দাফতরিক সিল ব্যবহার করে রাজউক পূর্বাচল, বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা এবং কেরানীগঞ্জে বিপুল সংখ্যক প্লট করেন।

অভিযোগ আছে তিনি বর্তমানে নামে-বেনামে দুই শতাধিক প্লটের অধিকারী। ২০১৯ সালে রাজউকের ৭০টি নথি নিজ কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে আইনবহির্ভূতভাবে হেফাজতে রাখায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা চলমান রয়েছে। এছাড়া দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করায় দুদক তার বিরুদ্ধে একটি মামলা করে। সেটাও চলমান রয়েছে।
গোল্ডেন মনিরের বাসায় র‌্যাবের অভিযান

জব্দ করা হয়েছে যা যা

র‌্যাবের মুখপাত্র বলেন, মনিরের বাসা থেকে প্রায় ১০টি দেশের বিভিন্ন পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। যার পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় ৯ লাখ টাকার মতো। প্রায় ৬০০ ভরি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি নগদ এক কোটি ৯ লাখ টাকা এবং বিলাসবহুল পাঁচটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে।

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, মনিরের বাসার নিচের পার্কিং থেকে বিলাসবহুল দুটি প্রাডো গাড়ি পাওয়া গেছে। গাড়ি দুটির কোনও বৈধ কাগজ দেখাতে পারেননি তিনি। তার মালিকানাধীন অটোকার সিলেকশন থেকে আরও তিনটি অবৈধ গাড়ি জব্দ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক দলের অর্থ জোগানদাতা

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তারা জানতে পেরেছেন মনির ১০-১৫ বছর ধরে একটি রাজনৈতিক দলকে অর্থ জোগান দিয়ে আসছেন। ওই দলের যেসব নেতা আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন তার কাছ থেকে তাদেরও খোঁজ করা হচ্ছে।

তিনটি মামলার প্রস্তুতি

র‌্যাব বলছে, তারা মনিরের বিরুদ্ধে মূলত ফৌজদারি অপরাধে, বিদেশি অনুমোদনবিহীন মুদ্রা রাখার জন্য বাড্ডা থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করবে। তাছাড়া অস্ত্র এবং মাদক রাখার অপরাধে অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক অস্ত্র ও মাদকের মামলা করা হবে। গ্রেফতার মনিরকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব-৩ এর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন
আডি/ ২১ নভেম্বর

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: