হেফাজতকে অন্ধ সমর্থন দিয়ে বেকায়দায় জাপা

ঢাকা, ০৪ মে – হেফাজতে ইসলামকে অন্ধ সমর্থন দিয়ে বেশ বেকায়দায় পড়েছে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলের আসনে থাকা জাতীয় পার্টি। বিশেষ করে রিসোর্ট কাণ্ডের পর তাদের দুইজন স্থানীয় নেতা আটক হওয়ায় অনেকেই এখন ঘরছাড়া বলে জানা গেছে।

হেফাজত ইস্যুতে উদারপন্থীরা এতোদিন নিরব থাকলেও পার্টির এই ভূমিকায় এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন। পার্টির এই সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী হিসেবে উল্লেখ করতেও ছাড়েননি। তারা মনে করছেন পার্টির চেয়ারম্যানের দূরদর্শিতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ধর্মভিত্তিক এমন একটি সংগঠনকে এভাবে অন্ধ সমর্থন দেশে মৌলবাদকে উস্কে দিতে পারে। যা খাল কেটে কুমির আনার সামীল।

জাতীয় পার্টি (এরশাদ) শুরু থেকেই হেফাজতে ইসলামকে অন্ধ সমর্থন দিয়ে এসেছে। ২০১৩ সালের (৫ মে) যেদিন ঢাকা শহরে অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে ঢাকার প্রবেশদ্বারে অবস্থান নেয়। আব্দুল্লাহপুর, কাঁচপুর ও যাত্রাবাড়ীতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। সেদিন খাবার নিয়ে ছুঁটে গিয়েছিল প্রয়াত এরশাদ। এরপর কর্মীদের তাদের পাশে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। মতিঝিলে যখন হেফাজতে ইসলাম তাণ্ডব চালায় তখন বিজয় নগর কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে হেফাজতের সমর্থনে মিছিল বের করা হয়। হেফাজত ইস্যুতে জাপা কখনই ঘটনা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একপেশে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে হেফাজতে ইসলাম। চট্টগ্রামের বিক্ষোভ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে পুলিশ অ্যাকশনে চলে যায়। এতে ৪ জন নিহত ও বেশকিছু কর্মী আহত হয়। সেই হতাহতের রেশ ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাণ্ডব চালায় ধর্মভিত্তিক এই সংগঠনটি। তাদের সেই তাণ্ডবলীলা থেকে থানা, আওয়ামী লীগের পার্টি অফিস, ছাত্রলীগ নেতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়ি, এমনকি সবার শ্রদ্ধার জায়গা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মৃতি জাদুঘরও রেহাই পায়নি। সেখানেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে হেফাজত। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ জাদুঘরে হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রগতিশীল ও সাংস্কৃতিমনা ব্যক্তিরা বিস্ময় প্রকাশ করেন। তারা মৌলবাদকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।

কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ওই ঘটনায় হেফাজতের পক্ষ নিয়ে বিবৃতি দেন জাতীয় পার্টি। পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ২৯ মার্চ দেওয়া বিবৃতি পুরো দায় সরকারের ওপর চাপিয়ে দেন। বিবৃতিতে বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের মধ্যে পুলিশের গুলিতে যে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে- তার দায়িত্ব সরকারকেই গ্রহণ করতে হবে।

বিবৃতিতে বলেন, দেশের সাম্প্রতিক সময়ে চলমান সহিংসতা, সংঘাত ও হানাহানির ফলে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন এই কয়েকদিনের বিক্ষোভে বিপুল সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটে গেছে। এটা অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং নিন্দনীয়। সরকারের সাথে যদি কোনো মহলের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়- তার মিমাংসা রক্তাত্ব পথে হতে পারে না। সরকারের নীতি, কর্মকাণ্ড এবং আচরণের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে-সাম্প্রতিক সময়ের আন্দোলনে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

অনতিবিলম্বে চলমান বিরোধ ও সংঘাতময় পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে হবে। এ ক‘দিনের ঘটনায় যারা নিহত বা আহত হয়েছেন- তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সরকারকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে- দমন-পীড়নে সংকট আরও ঘনীভূত হয়। সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন জিএম কাদের।

বিবৃতি কিংবা অন্য সভা সমাবেশে কোথাও একটিবারের জন্যও বিশ্ব বরেণ্য সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ জাদুঘরে অগ্নিসংযোগের বিষয়ে মুখ খোলেননি। অর্থাৎ সেটি তার কাছে কোনো ঘটনাই মনে হয় নি। বিষয়টিকে চরম বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেছেন অনেকই।

আমেরিকা ভিত্তিক সংগঠন এশিয়ান আমেরিকান ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স জাতীয় পার্টির এসব ভূমিকা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো একটি চিঠিতে বলেছেন, ইদানিংকালে দেখা যাচ্ছে করোনায় সমস্ত পৃথিবী যখন আতঙ্কিত সেই সময়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের গং ও জাতীয় পার্টির নেতা সোনারগাঁওয়ের স্থানীয় সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকার উসকানিতে হেফাজতে ইসলামের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে দেশে একটি অরাজকতা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার পায়তারা করছে। যা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য হুমকি স্বরূপ।

অ্যালান্সের বোর্ড অব ডাইরেক্টর উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, মর্মাহত এই ভেবে যে প্রধান বিরোধী দলের একটি অংশ এহেনো স্বার্থান্বেষী কার্যলকলাপে সমর্থন করছে। তারা দেশ বা জাতির কথা চিন্তা না করে ব্যক্তিগত স্বার্থকে বড় করে দেখছে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে এ সমস্ত কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের সুষ্ঠু তদন্ত করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে এলায়েন্স। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে পাঠানো ওই চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের মহাসচিব বরাবরে।

অ্যালায়েন্স সভাপতি শাহাবউদ্দিন বাচ্চু এই চিঠির বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, জিএম কাদের মৌলবাদকে উস্কে দিয়ে ফয়দা লুটতে চাইছেন। তার নিজের আন্দোলন করার ক্ষমতা নেই। দিনে দিনে বিবৃতি সর্বস্ব নেতা হয়ে যাচ্ছেন। হেফাজতের ওপর ভর করে সরকার পতনের স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু মৌলবাদ উস্কে দিলে ভবিষ্যৎ পরিণতি কি হবে সেটি তিনি ভাবছেন না। তার মনে রাখা উচিত ছিল নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পায় না। আমরা সরকারকে অনুরোধ জানাচ্ছি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য।

জাতীয় পার্টির একজন অতিরিক্ত মহাসচিব ও প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ভোটের রাজনীতিতে এখন হেফাজত ফ্যাক্টর। সাধারণ মানুষের সেন্ট্রিমেন্ট তাদের পক্ষে। তাই জাতীয় পার্টিও কিছুটা কৌশলী ভূমিকা নিয়েছে।

জাতীয় পার্টির কেন্দ্র যখন অন্ধ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তখন স্থানীয় নেতারাও অনেকে হেফাজত ইস্যুতে ফেসবুকে সরব। নারায়গঞ্জের রিসোর্ট কাণ্ডের পর দুই নেতা আটক হয়েছেন, অনেকের নামে মামলা হয়েছে। জাপার চেয়ারম্যান তাদের মুক্তি দাবি করে বলেছেন, জাতীয় পার্টির লোকজন কেউ ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। তাদেরকে অহেতুক হয়রানি করা হচ্ছে।

সূত্র : বার্তা২৪
এন এইচ, ০৪ মে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: